এরকমই এক নিভু নিভু বিকেলে বান্ধবীকে তার বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরছিলাম। আঠারো বছর আগের স্কুলরোড মাঠে সেদিনই পুজো প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধা শুরু হয়েছে। মেঘে মেঘে বিকেল যেন একটু বেশিই কালো ঠেকছে। বাঁক ঘুরতেই ছাতিম গাছের তলায় চারটি বাঁশের খুটি আর সামান্য টিনের চালে তৈরি ছোট্ট 'শ্রীকান্ত সাইকেল রিপিয়ারিং শপ'। দোকানের মালিক ছিপছিপে গড়ন, একমাথা ঝাঁকড়া চুলের এক দাদা। বয়স তখন আমার দাদার সমান বোধয়। উনিশ-কুড়ি। আমি তার নাম জানতাম না অথবা ভাবতাম 'শ্রীকান্ত'-ই তার নাম।
দোকান খোলা দেখে সাইকেলের টিউবের লিক সারাতে ঢুকলাম। তার আগেও দুয়েকবার সাইকেল সারাবার সুবাদে সে আমার মুখটুকু চেনে। দুটো লোহার টুলের মধ্যে একটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিজে বসলো আরেকটিতে। গুনগুন করতে করতে সাইকেলের টায়ার খুলতে লাগলো। পাশে টেবিলের উপর এফ.এম চলছে। ওতেই সম্ভবত গানটি প্রথম শুনেছিলাম, " তুমকো দেখা তো ইয়ে খয়াল আয়া...জিন্দগি ধুপ তুম ঘনা সায়া..." হলুদ বাল্বের আলোয় জগজিৎ কীরকম যেন মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের দুজনের উপরে।
দাদার বাড়ি কোথায়, সেখানে কে কে আছে এসবই কথা হচ্ছিল। ওঁর দেশ বিহারের ছাপড়া জেলার কোনও গ্রামে। জিজা-জী দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার ঠিকে শ্রমিক। জিজি-র বিয়ের সময় একেবারে দহেজের সঙ্গে সে-ও চলে এসেছিল। সেই থেকে রয়ে গেছে এখানেই। তার কথা বলাতে-ও গানের মতই সুর। বললাম, " দিওয়ালি-তে দেশে যাবে না ?" প্রশ্ন শুনে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো দেখলাম। আমতা আমতা করে বউ-এর কথা বললো। কোন এক আত্মীয়ের বিয়ে-তে গিয়েছিল, আর জোর করে বাড়ির লোকেরা বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তার-ও; এইতো গত শীতে-ই। হঠাৎ বউ-এর কথায় গুনগুন থামিয়ে লিক যাচাই করার জন্য জল আনতে চলে গেল ও। এফ.এম-এ গানটা তখনও ঘুরে ফিরে বাজছে। "তুম চলে যাওগে তো সোচেঙ্গে..." টিপটিপ দুয়েকফোঁটা থেকে বৃষ্টি ততক্ষণে ঝমঝমের রূপ নিয়েছে। দোকানের শেড-এ আরও কয়েকজন এসে দাঁড়ালেন। তারই মধ্যে একজন হয়ত দাদা'র পরিচিত। দুটো টাটকা বিড়ি ধরিয়ে দাদা-ও গল্প জুড়ে দিল সেই পরিচিতের সঙ্গে। গ্রামের গল্প, চাষের গল্প, রোজগারের গল্প...বিড়ি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল, ও আর সাইকেল সারছে না। এককোণে মাথা নিচু করে বসে আছে সেই ছেলেটির সঙ্গে। জানে বৃষ্টি না ধরলে আমারও যাবার উপায় নেই, তাই তাড়া করছে না। অথবা ছেলেটিকে ফেলে কাজে ফিরতে চাইছে না। ছেলেটি আধা ভোজপুরী, আধা বাংলায় বলছে, " পাগলামি করিস না ভৈরোঁ, এভাবে হয় না। দেশে ফিরে যা। সব ঠিক হয়ে যাবে।" ভৈরব মানে যাকে আমি শ্রীকান্ত নামে চিনতাম, ক্রমশ তার ঝাঁকড়া চুলের মাথাটা গুঁজে দিচ্ছে দু'পায়ের মাঝখানে। দুয়েকটি উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু হল, অশ্লীল কিছু শব্দ-ও; যার অর্থ তখন বুঝতাম না। ওদের খেয়ালই নেই আমি এমন দূরত্বে আছি যেখান থেকে সবটা শোনা যাচ্ছে। অথবা নেহাতই বাচ্ছা মানুষ ভেবে উপেক্ষা করেছে। সেসব কথায় কান না দিয়ে গান শোনায় ফিরে এলাম। "তুম চলে যাওগে তো...হমনে ক্যায়া খোয়া হমনে ক্যায়া পায়া..."
ভৈরব কাঁদছিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। এই বিচ্ছিরি আকাশটার মতোই। ইনিয়ে বিনিয়ে। অসহ্য লাগতেই উঠে দাঁড়ালাম। ছেলেটিও চলে যাচ্ছিল, যখন ভৈরব দাদা তার হাঁটু জড়িয়ে ধরে বললো, "বিলাস! ম্যায় ক্যায়া মর জাঁয়ু?"
যাবার আগে বিলাস শুধু এটুকুই বলেছিল, " মর যা শালে হিজড়া কঁহি কা..."
ভৈরব কাঁপছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইছে। এফ.এম বন্ধ হয়েছে অনেক্ষণ। বৃষ্টি-ও। ভৈরব নাক টানতে টানতে টিউবের লিক সারলো। চোখে মুখে কালি লাগলো; আবার সে কালি মুছতে গিয়ে বেশি করে লাগালো। সামনের রাস্তাটা, মাঠ জলে থৈ থৈ করছে তখন। দোকান থেকে বেরোবার সময় বলে এলাম, "এবারে দেশে যেয়ো কিন্তু ভৈরব-দা"...
সেদিন বাড়ি ফিরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল।
আজ বাস-এ ফিরছি যখন, গানটা শুনে সেই ভৈরবের মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বারবার। ছিপছিপে চেহারার, শ্যাম বর্ণ, ঝাঁকড়া চুলের ভৈরব'দা। বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে সে এখন কেমন আছে। কটি সন্তানের বাবা সে। জানতে ইচ্ছে করছে এখনও এ গান শোনে কি না। শুনতে শুনতে সেরকমই গুনগুন করে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর কি নিজেই জেনে ফেলিনি এতদিনে! অথবা আসলেই এ প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই।
"হম জিসে গুনগুনা নহি শকতে.... ওয়াক্ত নে অ্যায়সা গীত কিঁউ গায়া..."
----------
রচনাকাল : ২৪ আগস্ট ২০১৯
মন্তব্যসমূহ