কোয়ারেন্টাইন ডাইরিজ(৩)
"তবু যেতে হবে শালবন,
হয়ত ফুটেছে ফুল,
শালবন কখনো দেখিনি,
শালফুল হয়ত ফোটে না,
ফুটলেও যাবে না চেনা,কেন না এ পথ
........চলেছে নিঝুমপুর।"
পড়ছিলাম তারাপদ রায়-কে। 'নিঝুমপুর'...৭৮ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত একটি আখ্যান। পাঠের প্রথমেই বাধা পাই সুধীর মৈত্র-র আঁকা নিঝুপুরের ছবিটিতে। ছবিটির শিরোনাম এরকম হতে পারত,- "স্টিমার আসিছে ঘাটে পড়ে আসে বেলা..." আমাদের চির পরিচিত সহজপাঠের-ই প্রতিরূপ যেন।
নাহ! এ কোনও পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়। ভূমিকা মাত্র। এমনই স্বচ্ছল দুপুরে যখন নিঝুমপুরে বেলা পড়ে আসছে , সমান্তরালে আমার কন্যাসমা আমগাছটির কথা মনে পড়ছে! ওঁকে যখন ছেড়ে এসেছি, উচ্চতায় আমার সমান ছিল বোধয়। ছিপছিপে চেহারায় মানানসই পাতার বাহার। হেজ-বেড়াটির গায়ে ওঁর অষ্টপ্রহর জেগে থাকাটি মনে পড়ছে। জানি না আজ কতখানি বিস্তারিত হয়েছে সে। কত বড়ই বা গৃহস্থ। সময় তো জানাবার অপেক্ষা রাখে না।
আরেকটু সন্ধের দিকে প্রিয় চাঁপাগাছটির কথা ভাবি। যে বাড়িটির কথা বলছি তার সঙ্গে পরিচয় সম্ভবত আমার চতুর্থ শ্রেণী থেকে। সদ্য পাঠ্যবই-এ পড়েছি নরেনের দুঃসাহসিক গল্পখানি। চাঁপাগাছটি সম্পর্কে তাই বাড়তি কিছুটা সম্ভ্রম ছিল। বিশেষত সন্ধের দিকে জানলার বাইরে তাকাতাম-ই না, যেখান থেকে তাকে দেখা যেত। "নরেন সাহসী ছেলে, আমি নই!"- একথা তো ব্রহ্মদৈত্য-ও জানেন। অথচ সেই ফুলের-ই ঘ্রাণ কেমন জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। কী অমোঘ,মায়াময়। গাছটি বুঝি আর নেই! আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গী বাড়িটি-ও আজ অন্য কারও
রাত ক্রমে ঘন হয়ে এলে তুলো তুলো ঝিমলি-কে ফিরে দেখবার সাধ হয়। যখন ওকে প্রথম কোলে নিই, হাতের তালুর দৈর্ঘ্যের ছিল। ছাই-সাদা রঙ, গোঁফ জোড়া বয়সের তুলনায় সামান্য ভারিক্কি। হাবভাব-ও তদ্রুপ। মাতা সহ তিন জমজ ভাই-বোনের গৃহত্যাগের পরেও সে স্থির করেছিল আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমাদের সোফাটিতেই ঘুমোবে আর আমাদের-ই উঠানে রোদ পোহাবে। তারপর মনে আছে তার অসুখের দিনগুলিতে বহুবার চেষ্টা করা হয়েছিল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে অন্যকোথাও ছেড়ে আসার। ফিরে আসত। একবার...দুবার...তিনবার...শেষবার সে নিজেই ছেড়ে গেল আমাদের। ফিরে আসেনি আর।
ঘোর রাতে এইসব স্মৃতিপ্রবণতা প্রাইমারি ইস্কুলের পলাশগাছটির কাছে নিয়ে যায়। বয়সের ভারে অনেকখানি ঝুঁকে পড়েছে সে। দেখি শেষ বিকেলের রোদে মাখা একটিও সাইকেল আর নেই সেখানে। অথচ লেবু পাকবার ঘ্রাণ আগের মতোটি আছে। অসহ, প্রবল...
শেষরাতে আলো কমে আসে। নিরুদ্দিষ্ট অথচ আপাত সুখের ঘোরে আখ্যান শেষ হয়। সোনালী আভায় আবছায়া কাকে যেন মা-বলে ডেকে বসি ভ্রমে...
"অন্ধকারে কার গলা
যতদূর যেতে পারে তার থেকে
কিছু বেশি দূরে
নরম বালিতে মাথা রেখে
নিচে হাতের বালিশ
রেশম রেশম কেউ শুয়ে আছে।"
মন্তব্যসমূহ