কোকুন
উৎসর্গ : সেসব প্রজাপতিকে, যাদের কোকুন ছেড়ে আকাশ দেখা হয়নি এখনও
কোকুন দীর্ঘ দুবছর ধরে লিখে চলা আমার প্রথম উপন্যাস। এখনও তৈরির পর্যায়েই রয়ে গেছে। পরিণতি পায়নি। হয়ত পাবে কখনও, অথবা পাবে না। এরই কিছু কিছু অংশ পাঠকের পড়ার জন্য, পরিচিতির জন্য রাখছি এই ব্লগে। আজ তার প্রথম কিস্তি। প্রাককথন। আগামী পর্ব থেকে মূল উপন্যাস শুরু হবে। পছন্দ হলে মন্তব্য করবেন। সাইড বারে লাইক, ডিসলাইক ― দুটি অপশনই আছে। দুটিই সমানভাবে গ্রহযোগ্য। ধন্যবাদ।
প্রাককথন :
সুকৃতি বাড়ি ফিরেছে। শেষ নভেম্বরের শিরশিরে হাওয়ায় হঠাৎ আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নামা এক সন্ধেয় সে ফিরলো। শহরে উৎসবের রেশ কমে এসেছে এতদিনে। প্রতিমা নিরঞ্জনের পরবর্তী নিস্তব্ধতা যেন মণ্ডপ জুড়ে রয়ে গেছে দীর্ঘকাল। থমথমে, স্মৃতি নির্ভর নক্ষত্রের আলো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। স্মৃতি নির্ভরতা তাদের মৃত্যুর পরও জাগিয়ে রাখে দীর্ঘ দীর্ঘ আলোকবর্ষ। একদিন যে নক্ষত্র নেই তারও আলো এসে পৃথিবীতে পড়ে। কৃতি একরাশ জিজ্ঞাসা নিয়ে বারবার গিয়ে দাঁড়ায় প্রতিটি নক্ষত্রের কাছে। জন্মের পর থেকে সম্যক বোধশক্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত ছাদে উঠে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতি তার বাবাকে প্রশ্ন করতো আকাশে ওগুলো কী জ্বলজ্বল করছে। বাবা হেসে বলতেন আকাশে সার্কাস হচ্ছে। এ আলো তারই। কৃতি ততোধিক বিস্ময় নিয়ে বলতো, সার্কাসের তাঁবুতে কি ফুঁটো আছে বাপি? এমন আলো বেরিয়ে আসছে যে! আজ মেঘলা আকাশের এককোণে রাস পূর্ণিমার চাঁদ ফুটে আছে। স্মিত। উজ্জ্বল। কীর্তনময়। একাকী অথচ চারপাশ থেকে কারা যেন ঘিরে আছে তাকে। খুব ছোটবেলায় একবার রাসের মেলাতে গিয়েছিল কৃতি। একাধিকবার-ও। তবে এ স্মৃতি তার মনে থাকার কথা না! অথচ এই ফুটফুটে চাঁদকে দেখে তার মনে হল এমনই এক পূর্ণিমার দিনে কে যেন তাকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল মেলার মাঠে। বিক্ষিপ্ত কিছু দৃশ্য ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে শুধু। সার্কাসের তাঁবু ঘিরে অজস্র মানুষের ভিড় চোখে ভাসে। শিশুর কান্না, খেলনা গাড়ির শব্দ, স্টিলের বাসনের ঠুং ঠাং, ঘুরন চরকি, হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ সম্পর্কে ঘোষণা, টিকিট কাউন্টার ফেলে কৃতির চোখ ছুটে চলে কীর্তন মঞ্চের দিকে। আটচালা ঘিরে খোল-কত্তালের ছন্দে বুঁদ হয়ে পড়া বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের পাশে বসে তার কখনও না দেখা দাদু-দিদার কথা মনে পড়ে। আজ কোথা থেকে কোথায় ছুটে চলেছে সে ভাবনায় ভর করে। কুয়াশাঘন মাদ্রাসার মাঠ, ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে ফেরিওয়ালার সেই চলে যাওয়াটুকু জাগ্রত হয়ে ওঠে সহসা। এসব কখনো বাস্তবে দেখেছে কি না আজ মনে পড়ছে না। তবে তার অবচেতনে ছিল আজীবন! ভাবতে ভাবতে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে সে। মা-কে ডাকতে ইচ্ছে করে। খুব সম্ভবত এই একটি মানুষকেই চিনতে পেরেছে এ যাবৎ। জ্ঞান ফেরার পর থেকে প্রায় কুড়িদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কেবলই তার স্মৃতি হাতড়ে গেছে। স্পষ্ট কোনো দৃশ্য ফুটে ওঠেনি তবু। জীবন্ত কোনো মানুষও স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়নি। যারা বাস্তবে অক্লান্ত দাঁড়িয়ে থেকেছে দিনের পর দিন ঘুমন্ত কৃতির বিছানার পাশে, কেবিনের বাইরে, কাচের জানলার কাছে, যারা কথা বলার চেষ্টা করেছে, বলেওছে, ক্রমাগত স্মৃতিতে ঘা দেবার চেষ্টা করেছে তাদেরকে আদৌ কৃতি চিনতে পেরেছে কি না সন্দেহ। নাম মনে পড়েনি। মুখের আদল স্পষ্ট বুঝতে পারেনি। তবুও তারা থেকে গেছে এক অদম্য আশা নিয়ে। কৃতি হয়ত তার স্মৃতির কাছে একদিন ফিরবে। অন্তত ডাক্তারের অভিমত তো তাই বলে। এই স্মৃতিদীনতা আজীবনের নয়। একদিন না একদিন অতীত পুনরায় মুখর হয়ে উঠবে ঠিকই। ততদিন এই মানুষগুলো থাকবে। আজীবন থেকে যাবে তাকে ঘিরে। আপাতত যা বলতে চলেছি তা হল সুকৃতি আচার্য্যর কথা। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে প্রায় শাদা কাগজের মতো সরল সুকৃতির পূর্বজীবনের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিতেই এই লেখার অবতারণা। সুকৃতিকে জানা বা চেনা পাঠকের কাছে আবশ্যক নয়। লেখকের পক্ষ থেকে তাকে চেনানোটা আবশ্যক মনে হয়েছে মাত্র। সুকৃতি আচার্য্য, আমাদের বাড়ির বা প্রতিবেশীর, আত্মীয়ের বাড়ির অথবা বন্ধু মহলের পরিচিত মুখ। যার জীবনে আহামরি রোমাঞ্চ নেই, অসহনীয় বেদনা নেই, উজ্জ্বল আনন্দ নেই, গগনচুম্বী প্রাপ্তি নেই, নেই অর্জনের অহং, অপ্রাপ্তির হতাশাও। নিতান্তই সাধারণ এক জীবনকে সে বয়ে নিয়ে গেছে মাত্র। এই বহমানতারই চিত্র তুলে ধরতে চলেছি। এ গল্পের শুরু তার জীবনের যে কোনো পর্যায় বা সময় থেকে হতে পারত। আবার নাও হতে পারত। তবু সূচনা পর্বের কাল নির্বাচন করতে গিয়ে আমি বেশিদূর পিছিয়ে যেতে পারিনি। কখনও ঘটনাক্রমে অতীত প্রাধান্য পেয়েছে ঠিকই। ঘরে ফিরে এসে কাজের টেবিলে কৃতির প্রথম চোখে পড়েছে অফিস থেকে পাওয়া গতবছরের ডায়রিটি। কী মনে করে সে ডায়রিটি টেনে নিয়েছে বুকের কাছে। ঝুঁকে পড়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছে। ভাবছে এই মুহূর্তের থেকে যা যা মনে পড়বে সে লিখে রাখার চেষ্টা করবে। যদিও লিখতে সে ল্যাপটপেও পারতো। কেন কাগজ কলম বেছে নিলো, সম্যক ধারণা তার নিজেরও নেই। হয়ত নিজের স্মৃতির মতই শাদা পাতার শূন্যতা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পাতার এককোণে তারিখের উল্লেখ, ১২ই মে' দুহাজার কুড়ি। গল্পখানিও তাই এখান থেকেই শুরু করা যাক বরং।
( চলবে...)
মন্তব্যসমূহ