সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উপন্যাস ― কোকুন ( প্রথম পর্ব ) ১


পর্ব ১
'নিজের ভিতরে জাগি। আপাত স্থির যেরকম প্রবাহ জলের।'



চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই কৃতি বুঝতে পারলো ব্যাপারটা এবার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। নাজিয়ার অভাবটা এখনও তার ওয়েট মেশিন জুড়ে রয়েছে, গতকাল রাত্রি থেকে সেদিকেই চোখ চলে যাচ্ছে বারবার। বাপরে! থ্রী পয়েন্ট ও ইন এ সিঙ্গেল মান্থ! মনে মনে আরেকবার আওড়ে নিল সে। ঘুমের ঘোর তবুও কাটছে না। এক কাপ চায়ে যে ঠিক ক'চামচ নুন মিশিয়েছিল কয়েকবার মাথা চুলকেও আর মনে পড়ছে না। ও কে, ইউ আর গ্রোন আপ নাও...টেক এ ডিপ ব্রিদ এন্ড গেট আপ! হাত মুঠো, আরেকবার চায়ের জন্য রান্নাঘরের দিকে যাবে ভাবলো সে, এমন সময় অবধারিত যে ফোন কলটা আসার কথা; সেটাই এলো। 'হ্যালো' টুকু বলার জন্য যতটা শিরদাঁড়া সোজা করা যায় ততটাই সোজা হয়ে ফোন ধরলো কৃতি। অপ্রত্যাশিত কিছুই নয়। দেরি করে ওঠা এবং ঘুমের ঘোরে গলা জড়িয়ে যাবার সুবাদে গরম গরম আদর আপ্যায়ন ইত্যাদির পর সে শিরদাঁড়াখানি আবার নেতিয়ে পড়লো কুশনের গায়ে। মা...ও মা...শোনো না। আঃ ! প্লিজ থামবে তোমরা দু'জন। ফোনের ওপারে তখনও তুমুল চেঁচামেচি। আচ্ছা, বাপির প্রতিদিন বাজার যেতে চাইবার রহস্যটা কী সেটা একবার খোঁজ নিয়ে দেখো না, খালি খালি আমার পিছনে কেন পড়ে থাকো বলতো!...এতক্ষণে বোধয় ঘুম চটকে চল্লিশ হয়ে গেছে। মিস সুকৃতি আচার্য্য এবার ফুল ফর্মে দুচারটি ধমক ফিরিয়ে দিতে চাইলেন ফোনের ওপারের মিস্টার এন্ড মিসেস আচার্য্য-কে। গত একমাসের সকালের এই তো রোজনামচা। কখনও নুনে পোড়া তো কখনও চিনি ছাড়া চা-পান, অপরিসর ব্যালকনিতে খানিক ফ্রী-হ্যান্ড, সন্দেশের লিটার পরিষ্কার করা, তারপর এই ফোনের ওপারের শিশুদুটোর ধমক খাওয়া এবং তা উপযুক্ত সুযোগে ফিরিয়েও দেওয়া। অ্যন্ড অ্যাট লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট "ওয়ার্ক ফ্রম হোম, ওয়ার্ক ফ্রম হোম"
শোন, এদিকে তো তেমন কিছুই নেই। সবাই-ই কাজ শুরু করে দিয়েছে। মন্দিরা-ও তো আসছে দু'দিন হল। তুইও নাজিয়াকে ডেকে নে
― কী ! মন্দিরা মাসি কাজে আসছে? ওই অতখানি রাস্তা !...সাইকেলে ?...তোমাদের কি মাথাখারাপ ? আচ্ছা, মাস্ক পরে আসছে ?...জীবনে থ্রিলার এডভেঞ্চার কতরকমের যে হয় ! সে এই ষাটোর্ধ্ব ছেলেমানুষদুটিকে দেখে টের পায় কৃতি। যা খুশি তাই করো। আমি নিজের সঙ্গে সঙ্গে নাজিয়ার-ও লাইফ রিস্ক নিতে পারছি না। তোমরা রোজরোজ বাজার করো, চর্ব, চোষ্য গেলো... আমার জাস্ট কিচ্ছু বলার নেই।...এতদূর বলার পর কৃতি ফোন ছেড়ে ডেস্কে কনুই রেখে মাথা ধরে বসে থাকলো অনেক্ষণ। নাজু ডার্লিং...মাই সুইটহার্ট...তোর হাতের কড়াই চিকেনটা যে কতদিন খাইনি...হেইল লকডাউন...হেইল প্যান্ডামিক। নিজের মনেই গজগজ করছিল এমন সময় সন্দেশ কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠলো, "মিউ" সব সমস্যার পৃথিবীতে তার কাছে এই এক সমাধান যেন। সন্দেশের পিঠে বিলি কাটতে কাটতে ফোনের স্ক্রিনে নিউজ পোর্টালগুলো একে একে দেখতে থাকে কৃতি। "12th May ― 3,604 total positive cases in India"..."বঙ্গোপসাগরের বুকে আরও শক্তিশালী হচ্ছে সাইক্লোন।"...

*


মে-র প্রায় মাঝামাঝি এসেও এবারে খুব একটা তাপমাত্রা বাড়েনি কলকাতার। আর কিছু না হোক অফিস-কাছারি, স্কুল-কলেজ, যানবাহন সমস্তকিছু বন্ধ থাকার এটুকু সুফল মিলেছে অন্তত। সন্ধে থেকে টানা দুটো টেলি-কনফারেন্স সেরে কোনরকমে ভাত-ডালটুকু গরম করে খেয়েই আজ বিছানা নিয়েছে কৃতি। সন্দেশের তখনও বারান্দা সফর শেষ হয়নি। কৃতির-ও আর অপেক্ষা করার ধৈর্য ছিল না। এমন সময়, রাত তখন প্রায় একটা বোধয়; নাকের উপর একটা নরম কিছুর বিচরণ টের পেয়ে ঘুম ভেঙে যায় তার। ওই বদমাশ বাচ্ছা... কী করছিস এখন ? ক'টা আরশোলা মারলি শুনি ! থাবা চাটতে চাটতে সন্দেশের সংক্ষিপ্ত জবাব, "মিউউ!" তাকে কোলের কাছে পোটলা করে নিয়ে শুতে গিয়ে কৃতি দেখলো ফোনের লেড নোটিফিকেশন জ্বলছে নিভছে। দুটো মিসড কল সাড়ে বারোটার। সাম্য-র। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ, "ভাই, ইটস আর্জেন্ট।" 
উফ...মাঝরাতে মাল টেনে আবার বিরহ-বেদনা জেগেছে নির্ঘাত! ফোন সরিয়ে রেখে বালিশ টেনে চোখ বন্ধ করলো কৃতি। আবার পরক্ষণেই চমকে উঠে টানটান হয়ে বসে পড়লো। কিন্তু মালের দোকান তো এখনও খোলেনি ! তাহলে কি গাঁজা-টাজা জোগাড় করলো না কি ! নাহ, এ ছেলের কোনই বিশ্বাস নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল ব্যাক করে ফেললো তখনই। টানা দু-মিনিট কোভিড নাইনটিন সতর্কবার্তার পর মোহিত চৌহান মিহি সুরে গেয়ে উঠলেন, "ইয়ে দুঁরিয়া..." সাম্যর এই একটা কলার টিউন কিছুতেই সহ্য করতে পারে না কৃতি। বহুবার বলেওছে পাল্টে ফেলার কথা। যথারীতি সাম্য শোনেনি। ওরে আমার দেবদাস টুয়েন্টি-টুয়েন্টি রে! গজগজ করতে করতেই ওদিকে কল রিসিভ হয়েছে বুঝতে পারলো। কিন্তু পেছনে এত শব্দ যে কিছুই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না। কৃতি ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠলো, এই হতভাগা, কোন চুলোয় আছিস তুই ! এত শব্দ কীসের!
এই তো, হসপিটালে। সাম্যর কথা শেষ হতে না হতেই কৃতি প্রায় বিছানায় লাফিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো, হসপিটালে কেন ? কী হয়েছে তোর ? এই ! তুই বেঁচে আছিস তো! কৃতির ধমকানির চোটে সন্দেশ বেচারি ভয়ে এক লাফে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে। কিছু না, সকালে বলছি। ঘুমো এখন তুই। ওদিক থেকে নিচু গলায় জবাব আসে। 
― শোন ভাই, মাঝরাতে তোর তেজ সহ্য করার মতো ধৈর্য আমার নেই। তাড়াতাড়ি বল কী হয়েছে
― বললাম তো তেমন কিছু নয়। অরণ্যা'দি হস্পিটালাইজড।
অরণ্যা'দি আবার কে ! ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে কৃতি
আরে অরণ্যা'দি...অরণ্যা প্রধান। তুই-ও তো ওঁর লেখা পছন্দ করিস ভীষণ, অনুযোগের সুরে উত্তর দেয় সাম্য। এসব ব্যাপারে ও খুব সিরিয়াস, মানে লেখা-লিখির ব্যাপারে। আর একটা মোটামুটি জনপ্রিয় লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে তার ছদ্ম গর্ববোধ-ও রয়েছে। কৃতি ওর বিরক্তি কিছুটা আঁচ করতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলে, ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ, অরণ্যা প্রধান...রাইট। পরক্ষণেই আবার ধাতস্থ হয়ে বলে, এই ! কোভিড নাকি !
― নাহ ! তোকে কাল বলছি সব। আপাতত দরকার মিটে গেছে। আরও লাগলে হয়ত তোকে বলতেই হবে। সাম্যর ব্যস্ত স্বর টের পেলো কৃতি।
― কেন রে, 'ও-নেগেটিভ'?
― হুম...বহু কষ্টে এক বোতল প্রোভাইড করেছে হসপিটাল থেকে। আপাতত আর না-ও লাগতে পারে বলেছে। কনফার্ম হয়ত কাল জানা যাবে।
― তোর সঙ্গে কে আছে?
― আছে। রঞ্জন, শুভ্র... সবাই আছে।
― আচ্ছা, সাবধানে বাড়ি ফের। মাসিমণি-কে একা রেখে বেরিয়েছিস?
― টুকু এসেছে সকালে।
― ওহ! তাহলে তো চিন্তা নেই। হ্যাঁ রে, পুঁচকেটা কত বড় হল রে?
― হয়েছে, আসিস একদিন...
― এখন, এমন সময়? পাগল নাকি!
― ওই ভয়েই মরে যা তোরা। আমাকে দ্যাখ, নো ভয়-ডর
― হ্যাঁ আমার হনুমান অবতার...এবার ফোনটা রেখে ধন্য করুন। আর পৌঁছে একটা মেসেজ করে দেবেন দয়া করে।
সাম্য... সাম্যব্রত। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। সোনারপুরের মতো জায়গায় একটা দু'কামরার ফ্ল্যাট, বাবার পেনশনের টাকা আর তাঁর শিক্ষকজীবনের নীতি ― সাম্য-র জীবনের সঞ্চয় বলতে এটুকুই। তাও সাত-আট মাস হল বাবা মারা যাওয়ায় পেনশনের টাকাও আপাতত অর্ধেক। বাড়িতে মা আর এক বোন। সাম্য আর ওর বোন যমজ। বোন বছর দেড়েক হল বিয়ে করেছে। তন্ময় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মন্দের ভালো। এই তো পাঁচ মাস হল ফুটফুটে একটা বোনঝি হয়েছে সাম্য-র। নিজে টুকটাক টিউশন পড়ায়। বাকি লেখালিখি নিয়েই পড়ে থাকে। আর ওই...কোথাও ডাক পড়লেই ঝড় জল বাদল উপেক্ষা করে ছুটে যায়। এটুকু নিয়েই সাম্য একজন খাঁটি মানুষ। সরল। তবে স্থির নয়। বিশেষত গলায় কিছু পড়লে তো একেবারেই নয়। সে অবস্থায় সাম্যকে একেবারেই বিশ্বাস করে না কৃতি। সাম্যর সঙ্গে কৃতির দেখা হওয়াটাও একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কলকাতায় আসার পর পরই এক পেশেন্টের জন্য ব্লাড দিতে গিয়েছিল কৃতি, কলকাতা মেডিকেল-এ। আসলে 'ও- নেগেটিভ' গ্রুপ হবার দরুন একটা ডোনার কার্ডের ব্যবস্থা বহু আগেই করে রেখেছে সে। তবে খুব পরিচিতি না হলে সচারচর যায় না। সেবার গিয়েছিল কলেজের এক বান্ধবীর মায়ের জন্য। সাম্য-র বাবা-ও সে সময় মেডিক্যালে ভর্তি। ব্লাড দিয়ে ফিরতে গিয়ে হাসপাতালের করিডোরেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় কৃতি। ভাগ্যিস সাম্য আর ওর দুয়েকজন বন্ধু কাছাকাছি ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তুলে এনে তাকে শুইয়ে দেওয়া হয় করিডোরের টেবিলে। কিছুক্ষণ বাদে ডাক্তার দেখেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল জ্ঞান ফিরতে। প্রেসার ফল করেছিল হঠাৎ। ডোনেশনের আগে টেস্টে অবশ্য বোঝা যায়নি। তারপর থেকেই ব্লাড ডোনেশন বিষয়ক, লেখা বিষয়ক টুকটাক কথা হতে থাকে দুজনের। দু'তিন মাসের মাথায় সাম্য-র বাবা মারা যাবার পর একটা আশ্রয়, সহচর্যের খোঁজে ও যেন আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কৃতির উপর। কিন্তু কৃতির কাছে সাম্যর নির্ভরতাটুকু অভিপ্রেত ছিল না। ভালো বন্ধুত্ব ছিল অবশ্যই। তাই বলে প্রেম ! সাম্য ক্যান নেভার বী হার বয়ফ্রেন্ড ! কাজেই ব্যাপারটা খুব সাবধানে এড়িয়ে চলে কৃতি। অথচ সাম্য-কে সে কষ্ট দিতেও চায় না কখনও। ভীষণ দুশ্চিন্তা করে ওকে নিয়ে। কথায় কথায় ঝগড়া করে, শাসন করে। বিরক্ত-ও হয় মাঝে মাঝে। জড়াতে না চেয়েও অনেকখানিই সে জড়িয়ে থাকে সাম্য-র সঙ্গে। আর সাম্য ? সে হয়ত এটুকুই 'ভালোবাসা' জেনে কবিতা লেখে, অথবা এর বেশি চাওয়া-কে অনধিকার বলে মনে করে। পার্থিব জীবনের মূল্যটুকুই তার কাছে অনেক কম। আজীবন সে অল্প নিয়েই থেকে যেতে চায়। তাছাড়া কৃতি ― 'সুকৃতি আচার্য্য, সিনিয়র সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার' এই প্রসস্পেক্ট সে কোথাও মেলাতে পারে না তার খদ্দরের পান্জাবী আর বোহেমিয়ান আদব-কায়দার সঙ্গে। 

( চলবে... )

মন্তব্যসমূহ