সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মেয়েবেলারা


আজকাল বিকেলের কাছে গুটিগুটি এসে বসে মেয়েবেলা l দূরে রথের দড়িতে টান পড়লে আকাশের মুখভার হয়ে ওঠে নিমেষেই l নাহ্ ..সময়ের আর মেলায় ফেরা হয়'না l কাদা পায়ে রেখে আসা হয়'না বয়ঃসন্ধির ছাপ l বাদাম ভাজার গন্ধে যাবতীয় চাওয়া পাওয়া খুঁজে নেওয়া আঙ্গুলের ফাঁক দিয়েই এখন  অনায়াসে গলে যায় একেকটি মেঘমাস l নির্লিপ্ততা যাপন করে আষাঢ়ের দিন  l আজীবন নাগরদোলায় অনাশক্ত চোখগুলোকে প্রাণপণে ফিরিয়ে নিই আলোর দিকে ,কোলাহলের দিকে ,মাটির পুতুলের দিকে ..এখনও মনে মনেই l অথচ ছুঁয়ে দেখা হয়'না আর রঙবেরঙের কাগজ ফুল l আলোর পোকারা ভীড় করে থাকে পাঁপড়ি চাটের আশেপাশে আজ'ও ,শুধু আমাকেই বড় অচেনা লাগে তাদের l সঙ্গে আনা লিস্টের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে বই কেনার বিকেলগুলো অযথাই খরচ হয়ে গেছে জেনে ফিরে আসে শব্দের খুচরোরা l আমায় নতুন বইয়ের গন্ধ চেনাতে হঠাৎ বৃষ্টি বোঝাই করে হেঁটে আসে নীল লুঙ্গি ,চওড়া বুকের ফেরিওয়ালা  l উঠোন ভর্তি ছড়িয়ে থাকে মেলায় যাওয়ার বায়নাগুলি ....মেয়েবেলারা পায়ে পায়ে উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে l কার্ণিশের কাছাকাছি এসে আটকে থাকে ছেঁড়া ঘুড়ি l ওর গায়ে লাল পাহাড়ের গল্প লেখা থাকে l শেষ বিকেলের টিউশন ফেরত স্কার্টের গল্প লেখা থাকে l নোটস্'র খাতা খোলার আগেই অন্ধকার নেমে আসে সিঁড়িঘরে l আমার আর পড়া হয়ে ওঠেনা শেষ পাতার ফোর লাইনার'টা l বরাবরের মত এবারও ছন্দ ঠিক করে দিতে ভুলে গেছি ভেবে অভিমানে বেঁধে রাখে কিশোরী আবেগ l ছেড়ে দিলে আকাশ দূরে চলে যায় ....খুব দূরে ..
মাঝেমধ্যে আলাপ জমাতে আসে ছাতিম কৃষ্ণচূড়ারা ....ওরা রাস্তার কথা বলে .....পলাশরঙা ছায়াদের গল্প শোনায় l বুড়ো পলাশের নিচে আজও না কি সাইকেল দাঁড়িয়ে থাকে ,একইভাবে l ওরা আলো আঁকতে শেখে ....বিকেল আঁকতে শেখে ,তারপর সন্ধে নামলেই ফিরে যায় যে যার নামের মলাটে l
:
তখন লক্ষী বারের আল্পনায় সন্ধে আঁকা হ'লে ...শঙ্খধ্বনি ...মাটির প্রদীপ ..এসব গুছিয়ে রাখতো চোখ l মা ডাকের কাছে নতজানু হয়ে বসতো আমতেল আর মুড়ির যুগলবন্দী সন্ধেরা ....দাদু দিদিমা ,ঠাকুমা দাদু ....এসব পুঁজি ছিলোনা যে মেয়েবেলার....রূপকথার ঘোরে সে একাই পেরিয়ে আসত একেকটি দৈত্যপুরী.....রাফেনজেলের চুলের ডগায় বেঁধে আসত রাজপুত্রের চিঠি ....l রূপকথার পর আর স্বপ্ন হয়'না আলাদারকমের l রাতের বুকে মাথা রেখে সে ছবি আঁকতে বসত নতুন রঙ পেন্সিল হাতে ......আকাশ .....মেঘ ....মেঘের পরে সার্কাসের তাঁবু l তাঁবুর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরের আলো ....বাবা তাদের নাম বলেছিল "তারা "....মেয়েবেলা মেলার মাঠে গেলেই সবটুকু মিলিয়ে নিত বর্ণনার সাথে l মিলেও যেত অক্লেশে l আজকাল দিন রাতেরই হিসেব মেলে না তেমন l চায়ের কাপে ফুটতে ফুটতে মিলিয়ে যায় সিঁড়ি ভাঙার অংক l আঁচলের কাছেই ক্রমশ ঋণী হয়ে ওঠে এ আষাঢ়ে গল্পগুলো l মেয়েবেলা ফিরে যায় বৃষ্টির কাছে...আকাশের কাছে l মেলার মাঠে সার্কাসের তাঁবুতে আলো জ্বলে থাকে সারারাত ....কোলাহল ঘুমিয়ে থাকে রথের চাকার চারপাশে l ওরা পাহারা দেয় আরো কত মুঠো মুঠো বৃষ্টিফোঁটাদের l
সত্যিই স্বপ্নেরা আজও রূপকথাই, কেবল নতুন রঙ পেন্সিলে ছবি আঁকা হয়'না কখনও ।
---------------------
রচনাকাল : ২০১৭

মন্তব্যসমূহ