সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উপন্যাস — কোকুন ( প্রথম পর্ব ) ২

*
পরের দিন স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশিই বেলাতে ঘুম ভাঙলো কৃতির। মাথা তুলতেই চোখে পড়ল সন্দেশ ঘাপটি মেরে বসে আছে ওর পায়ের কাছে। কৃতির ডাক পেয়ে ধীর গতিতে উঠে এলো তার কোলের কাছে। গুটিশুটি মেরে কৃতির শরীরের ওম নিতে লাগলো। কী হয়েছে রে বাবু, এত ভয় পাচ্ছিস কেন, এই তো আমি দ্যাখ, সন্দেশকে আদর করতে করতে বলছিল কৃতি। যতই আরাম পায়, সন্দেশ আরও যেন সেঁধিয়ে যায় কৃতির বুকের ভেতরে। বাচ্ছাটার এরকম ব্যবহার ওর পরিচিত। তথাকথিত মানুষ নামক জীবটির চাইতে ওরা অনেকটাই বেশি সেনসিটিভ। যে কোনও অস্বস্তিকর সম্ভাবনার আঁচ ওরা পায়, এবং রিয়েক্ট-ও করে। সন্দেশ এরকম কিছুর আঁচ পেলে কৃতিকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। যতখানি সম্ভব ওর শরীর ছুঁয়ে থাকে। চুপচাপ। মুখে কিচ্ছুটি বলে না। সন্দেশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে কৃতি এখন তাকিয়ে আছে কাচের জানলাটার দিকে। রাত্রে বরাবর জানলা বন্ধ করে শোওয়া অভ্যেস কৃতির, সে যতই গরম হোক না কেন। একে তো সন্দেশের রাত্রে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, আর সে নিজেও অস্বস্তি বোধ করে। বন্ধুরা শুনলে হয়ত আবার খ্যাপাবে তাকে। সত্যিই এতখানি বড় হয়েও কৃতির ভূতের ভয়টি আর গেল না ! ফ্ল্যাটের এদিকের জানলাটা যদিও পূর্বমুখী, তবুও আজ সূর্য মশাইকে তেমন দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যাশিত-ই ছিল যদিও। ভোরের থেকে ঘিনিঘিনি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলাটা বন্ধ থাকার সুবাদে যেটুকু অনুভব করা যাচ্ছিল না, সেটুকুই টের পেল ব্যালকনিতে এসে। চারদিকটা কেমন যেন থম মেরে আছে। অবশ্য থমথমে গত দেড়-মাস ধরেই। তবুও দুয়েকজন মানুষ তো দেখা যায়। এখন প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। ওম টাওয়ারের এদিকটা থেকে বড় রাস্তার কিছুটা অংশ দেখা যায়। স্বাভাবিক দিনে বাস, ট্যাক্সির শব্দে গমগম করে পুরোটা। শকুন্তলা পার্কের দিক থেকে একের পর এক অটো ছুটে যায় চৌরাস্তার দিকে।  সেসব যদিও বহুদিন হল আর দেখেনি কৃতি। আর কবে যে আবার দেখবে, সেসব-ও ওই ভগাদা-ই জানেন। নাস্তিকের ভগবানরা বোধয় ভগা'দা নামেই পরিচিত। তো ভগা'দার ঘাড়ে সমস্ত দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে কৃতির চোখে পড়লো বড় রাস্তায় জল জমতে শুরু করেছে। বেহালার জল রীতিমত খবর। কলিগ বা জুনিয়রদের অনেকেই প্রায়ই ঠাট্টা করে কৃতিকে নৌকো কেনার সাজেশন দেয়। তবুও এই জায়গাটা, ফ্ল্যাটটা ওর খুব পছন্দ। বিশেষত বেশ হোমলি ফীল করে এখানে সে। কাকার ফ্ল্যাট। তবে কর্মসূত্রে তিনি এখন থাকেন পাঞ্জাবের বর্ডারে।  কাকিমণি মারা যাবার পর ফ্ল্যাটটা ফাঁকাই পড়ে ছিল। কৃতির কলকাতায় ট্রান্সফারটা হয়ে যাওয়াতে সবাই এককথায় তার এখানেই থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। নিরাপত্তার কথা ভেবে কৃতিও আর অন্য অপশন দেখেনি। তবে বেহালা থেকে রাজারহাট যাওয়াটা সাধারণ দিনগুলোতে একটু হেকটিক। তার উপর প্রজেক্ট এমনই যে আসা যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। বারেবারে দমকা হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছিল কৃতির চোখে-মুখে পড়া চুলগুলো। টি-শার্টের ভেতরে ঢুকে ফুলে উঠছিল। কখনো ছুটে যাচ্ছিল সামনের নারকেল গাছটার মাথায়। মেঘের অন্ধকারে দূরে গ্রীন টাওয়ারের আলো জ্বলে আছে, এই সকালেও। যে কয়েকটা-ও বা চড়ুই, শালিখ চোখে পড়ত নীচের পার্কিংয়ে, উঠোনে, সে ক'টাও চোখে পড়ছে না। হাওয়ার এই জাগলারি আজকে কেমন যেন একটু অন্যরকম ! তবে কি আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস এবারে সত্যি সত্যিই মিলে যাবে! কৃতির কেমন যেন গা শিরশির করে উঠলো। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফিরে এলো ঘরের ভিতরে। সন্দেশ তখনও একইভাবে বসে আছে ওর গায়ে দেওয়া চাদরের উপরে। রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল চাপিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে মনে পড়লো সাম্য-র কথা। ইস... একবারে ভুলে মেরে দিয়েছি! ছুটে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ফোনটা তুলে দেখলো সাতটা মিসডকল। একটা মেসেজ। "তিনটেয় পৌঁছেছি, টানা দুপুর পর্যন্ত ঘুমাবো। ডাকিস না" সাম্য-র মেসেজ পড়ে মুখ ভেংচিয়ে উঠলো কৃতি। পাঁচটা মিসডকল বাপির। দুখানা নাজিয়ার ! খানিক ভেবে নাজিয়াকেই কল ব্যাক করলো প্রথমে। মা রে...আছিস কেমন ?..."আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, ফাটিয়ে রান্না করছি, বুঝলি...হ্যাঁ তো, ওই তো বকুলতলায় মোটামুটি দুয়েকজন বসে। ওরাই বেলা করে গেটে নিয়ে আসে। পঙ্কজ'দাকে বলে রেখেছি, এলেই ডেকে দেয়...মাছ! হ্যাঁ মানে মাছ তো...না না ডিম তো কিনেই রেখেছি... এসব অজুহাতের কতখানি যে নাজিয়া বিশ্বাস করেছে বলা খুবই শক্ত। কথার ফাঁকে ওদিক থেকে প্রশ্ন এলো, থাইরয়েডের ওষুধটা ? খেয়েছ ? এতক্ষণে টনক নড়েছে কৃতির। আরে এই তো খাচ্ছিলাম। ওই তো চায়ের জল চাপিয়েছি...রান্নাঘরের দিকে ছুটতে ছুটতে কথা বলছিল কৃতি। চা রীতিমত পুড়ে কালো হয়ে গেছে। একটা ঢোঁক গিলে গ্যাসের নব বন্ধ করতে করতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল কৃতি, নাজু রে, তুই কবে আসবি ?
আমি তো যাবার জন্য বসেই আছি দিদি। তুমিই তো বারণ করে রেখেছ। আমার কি এখানে থাকতে ভালো লাগে সারাদিন, বলো তো, উত্তেজিত হয়ে বলে নাজিয়া। 
― কী করব বাবু, সিকিউরিটি থেকেও ঢুকতে দেবে না রে। আর ক'টা দিন দেখ না। এই মাস'টা শুধু। তারপর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
একবার বলেই দেখো না গো দিদি। নাজিয়ার গলায় অনুনয়ের সুর। নাজিয়ার সমস্যাটা বোঝে কৃতি। চারটে জুয়ারে ভাই আর মাতাল বাবার সংসারে তার এতদিন একটানা কর্মহীন থেকে যাওয়াটা অসহ্যই বটে। এখন তো আবার লকডাউনে ভাইগুলোর কাজ-কর্মও নেই। কী কুক্ষণে যে সেদিন গিয়েছিল বাড়ি বাপকে টাকা দিতে। না গেলে বোধয় এখানেই থেকে যেতে পারত। সিকিউরিটি কিছু করতে পারত না। মেয়েটার জন্য চিন্তা হয় কৃতির। একেই কাতারে কাতারে পরিযায়ী শ্রমিকরা জীবন পণ করে বাড়ি ফিরছে। উফ, চিত্রটা কল্পনা করেই শিউরে উঠলো সে। নাজিয়ার ফোন কাটার পর বাপির ফোনের রিং বেজে উঠলো। বোধয় অনেক্ষণ ধরেই চেষ্টা করছিল। এঙ্গেজ পেয়েছে। ব্যস, মায়ের একটা ধমকও মাটিতে পড়বে না, মোটামুটি প্রস্তুত হয়েই কল রিসিভ করল। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলল, এই তো, নাজিয়ার সঙ্গে কথা বলছিলাম ফোনে।...আচ্ছা মা, ওদিকের ওয়েদার কেমন গো?...বৃষ্টি হচ্ছে রাত্রি থেকে?...খাবার দাবার সব আনা আছে তো?...বাপি নিশ্চয় টিভি থেকে চোখ সরায়নি?...আচ্ছা শোনো না, ফোনটা চার্জ দিই, বুঝলে। গতিক খুব একটা ভালো বুঝছি না এদিকে...হ্যাঁ হ্যাঁ, ফ্ল্যাটের সেন্ট্রাল ইনভার্টার ব্যাকআপে আছে, তবুও বলা যায় না। তোমরা তাড়াতাড়ি রান্না সেরে ফেলবে। টর্চ, চার্জার সব ঠিকঠাক হাতের কাছে থাকে যেন...হ্যাঁ, দুটো নাগাদ-ই তো শুনছি। এদিকে এখনও বেশ জোরেই হাওয়া বইছে।" কথার ফাঁকেই কৃতি দেখলো দূরে বকুল গাছের মাথাটা কালো হয়ে আছে। পাতাগুলো থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে চকচক করছে যেন। কচি কলা পাতার মতো ঝকঝকে রং। চারতলার কার্নিসের উপর দিয়ে সবেগে একটা কাক উড়ে গেল। পঙ্কজ'দা ― সকালের শিফটের সিকিউরিটি গার্ড ছাতা মাথায় কোথা থেকে এল যেন। হাঁটু অবধি ট্রাউজার গোটানো। মুখের মাস্ক গলায় ঝুলিয়ে একমনে বিড়ি ধরিয়ে বসেছে সে। কৃতি চোখ ফিরিয়ে ফোনের স্ক্রিনে ফেসবুক খুলে বসলো। সর্বত্র শুধু একটা শব্দেরই বিভিন্ন রূপ আজ। "আম্পান...উমপুন...আমফান..."
***

( চলবে ...)

মন্তব্যসমূহ