সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উপন্যাস — কোকুন (প্রথম পর্ব ) ৩


রাত্রির ঘোর তখনও রয়েছে। জীবনে এরকম নিদ্রাহীন, আতঙ্কের রাত্রি বোধয় এর আগে কখনও কাটেনি কৃতির। সারারাত্রির ঝড়ের শব্দের যে অনুরণন, তা থেকে বেরোতে পারছে না কিছুতেই। সকাল তখন প্রায় ছ'টা হবে। ভোরের দিকে ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছিল তার। সম্বিৎ ফিরলো একটা হৈ-হৈ শব্দে। মাথা তুলে দেখলো বন্ধ জানলা দিয়ে সূর্যের হালকা গোলাপি আলো এসে পড়ছে। ওটুকুই যা আলো। বাকিটুকু ঘর ভর্তি অন্ধকার। মাঝরাতের পরেই এপার্টমেন্টের ব্যাক-আপ ইনভার্টার ফেইল করেছে। একটানা একটা সাইরেনের শব্দ হয়ে চলেছে। সেই গতকাল সন্ধের পর থেকেই। বোধয় পাশের গ্রীন টাওয়ারের সিকিউরিটি সিস্টেমের শব্দ। ষোল তলার বিল্ডিং। ক্ষয়ক্ষতি কিছু হয়েছে কি না কে জানে। কৃতিদের এপার্টমেন্ট সে তুলনায় অনেকটাই ছোট। পাঁচ তলা মাত্র। ক্ষতির সম্ভাবনাও কম। উপরের তলার দুয়েকটা জানলার কাচ ভেঙে পড়ার শব্দ পেয়েছিল যদিও। চোখ বন্ধ করে শুধু রাতটুকু পেরোবার অপেক্ষায় ছিল। এখন ঘুম ভেঙে সন্দেশকে-ও খুঁজে পাচ্ছে না কৃতি। রাত্রে তো কোলের কাছে নিয়েই শুয়েছিল। গেল কোথায় ! ও তো এরকম সময় কৃতিকে ছেড়ে কোথাও যেতেই পারে না। ফোনের চার্জও প্রায় শেষ। বেশ কয়েকজনকে পরপর ফোন করে নিতে  হবে এই মুহূর্তে। তারপর পাওয়ার ব্যাংক সহায়। প্রথমেই বাবার নাম্বারে ট্যাপ করলো কৃতি। কী গো, ঠিক আছো তো? আর কারেন্ট? নেই, না?...মা কী করছে? এক নিঃশ্বাসে বলে যেতে লাগলো সে। ওদিক থেকে সামান্য উদ্বিগ্ন তবে শান্তই মনে হল বাবাকে। সেই গতকাল দুপুরের পর এই প্রথম কথা হচ্ছে বাবার সঙ্গে। ছাদের গাছ প্রায় একটাও আস্ত নেই! মা ভোর থেকে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাছের পেছনেই লেগে আছে। কৃতি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো, শোনো, বৃষ্টিটা কিন্তু আজ সারাদিনই হবে। আর হ্যাঁ, ফোনের চার্জ কিন্তু বাঁচিয়ে রেখো। এর বেশি আর কথা বলার সুযোগ ছিল না। পরের নাম্বার নাজিয়ার। ওদিকের অস্থির প্রশ্নের উত্তরে কৃতি মাথা নেড়ে বললো, আরে হ্যাঁ রে বাবা, ঠিক আছি। কিচ্ছু হয়নি।...এই তো জাস্ট চা বসাব। নাজিয়াদের আশেপাশের প্রায় সব ঝুপড়ির চাল-ই উড়ে গেছে কালকের তাণ্ডবে। আসবাবপত্র, বাসন সব পূর্ব সতর্কতামতো গুছিয়ে সামলেই রেখেছিল সবাই। নাজিয়ারা এখন লোকাল প্রাইমারি স্কুলে রয়েছে। ঝড়ের সময়েই বিকেলের দিকে পরিস্থিতি যখন খারাপের দিকে যাচ্ছে, তখনই তাদের পাড়ার সকলকে সরিয়ে আনে স্থানীয় কমিটির লোকজন। জল একটু নামলে তারা ফিরে যাবে। এখন আপাতত সেখানেই খিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সংক্ষেপে এটুকু বুঝেই খানিক স্বস্তি পেল কৃতি। সাম্যর সঙ্গে কথা হল না। জেঠিমা ফোন ধরেছিলেন। সাম্য সারারাত পাশের বস্তিতে ছিল। এই একটু আগেই ফিরে এসে ঘুমিয়েছে। এটাই যদিও অভিপ্রেত। সামান্য খবরাখবর নিয়েই সৌজন্য সহকারে ফোনটা কেটে দেয় কৃতি। দু-চারজন কলিগ, বন্ধু বান্ধবের ফোন এসেছে এরই মধ্যে। সবার ফোন রিসিভ করা সম্ভব হয়নি। ইচ্ছেও করছে না আর। এবার সন্দেশের খোঁজটা করা দরকার, এই ভেবে সে বেরিয়ে এলো ব্যালকনিতে। নিচের বাগানের লন্ডভন্ড টবগুলো গুছিয়ে রাখছিল পঙ্কজ'দা আর শওকত চাচা। কৃতি একটু ঝুঁকে পড়ে যথাসম্ভব জোর গলায় বললো, পঙ্কজ'দা সন্দেশকে দেখেছ কোথাও? সকাল থেকে একেবারেই দেখতে পাচ্ছি না। এর আগেও দুয়েকবার এমন হয়েছে। কৃতির অসাবধানের সুযোগে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। কখনো পঙ্কজ'দা খুঁজে নিয়ে এসেছে কখনো সে নিজেই ফিরে এসেছে এক-আধ বেলা পর। কিন্তু আজকের বেরিয়ে যাওয়াটা একটু অস্বাভাবিক। এই ঝড় জলে বিপদের মুখে সন্দেশের বেরিয়ে যাওয়াটা খুব চিন্তায় ফেলেছে কৃতিকে। না গো দিদিভাই, দেখিনি তো! কৃতির চিন্তিত ভঙ্গি দেখে পঙ্কজদা আশ্বস্ত করলো তাকে। দাঁড়াও দাঁড়াও এদিকটা বাগিয়ে আমি একবার দেখে আসছি পাশাপাশি। 
পাওয়ারের কী খবর গো? আমার তো কল আছে বেলার দিকে আবার প্রশ্ন করে কৃতি।
― আসবে। জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে না। প্রচন্ড ডিমান্ড। সব এপার্টমেন্টেই তো এক অবস্থা। আর আমাদেরটা একটু ছোট তো...হয়ে যাবে তবু
বৃষ্টির জোর মাঝে মাঝেই বাড়ছে। সঙ্গে দমকা হাওয়া। মুখ ভার করে প্রায় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া চায়ে তেঁতো মুখে চুমুক দিলো কৃতি। মনটা আরো তেঁতো হয়ে উঠলো যেন। বছর আঠারো-উনিশ আগের এরকমই এক বৃষ্টির সকালের কথা মনে পড়ে গেল তার। বর্ষা এমনিতেই তার প্রিয়তম ঋতু। তবে আজকের মতো বৃষ্টিকে এত অসহ্য মনে হয়নি কখনো। অথবা আরেকবার মনে হয়েছিল বলা যায়। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল কৃতির সেই দিনটার কথা। সম্ভবত ক্লাস নাইন তখন। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার অধীনস্থ এক  গার্লস স্কুলের ছাত্রী সে। সে বছরই কারখানার মন্দার কারণে এবং কম ছাত্রীসংখ্যার অজুহাতে একের পর এক স্কুল মার্জ হয়ে যেতে থাকে। কৃতিদেরও স্কুল উঠে গিয়ে সেই বিল্ডিং এ ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুল খোলা হয়। কৃতিদের বাক্স প্যাটরা সহ ক্লাস শুরু হয় একটু দূরের অন্য একটি গার্লস স্কুলে। কৃতিদের মর্নিং সেশন আর ওই স্কুলটির ছাত্রীদের স্বাভাবিক ডে সেশনে স্কুল চলতে থাকে। এরকমই এক অকাল  বৃষ্টিমুখর দিনে অষ্টম পিরিয়ডেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। ফেরার সময় তাদের তিন চারজন বন্ধুর প্রিয় খেলা ছিল সাইকেল রেস। সেদিনও রেইনকোট, টুপি পরে তাদের সাইকেল রেসের প্রস্তাব দেয় চিত্রিতা। এখন ভাবলে খুব অস্থির হয়ে পড়ে কৃতি। কেন যে চিতার কথায় সেদিন হ্যাঁ বলে দিয়েছিল! কখনো হালকা কখনো বা তুমুল বৃষ্টির মাঝে তিনচারটে সাইকেল দ্রুত গতিতে ছুটছিল ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে। ঘনঘন সাইকেল, রিকশা, বাইক, বাস পেরিয়ে যাচ্ছিল উভয় দিক থেকে। ওদের কারোরই হুঁশ ছিল না সেসবের। রেসের সময় থাকেও না। তবে অন্যান্যদিন দুপুরের দিকে ছুটি হত বলে রাস্তা বেশিরভাগই ফাঁকা থাকত। কিন্তু পরিস্থিতি যে বদলেছে, সে খেয়াল তাদের কারোরই ছিল না। একেই অফিস টাইমের ব্যস্ত রাস্তা। সারারাত বৃষ্টি হয়ে জল জমে পিছল হয়ে আছে একেক জায়গা। হঠাৎই সামনে থেকে ধেয়ে আসা মিনি বাসটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে অসাবধানে অথবা স্বেচ্ছায় প্রায় ওর সাইকেল ঘেঁসেই ছুটে চলা চিত্রিতার সাইকেলের পেছনের চাকায় পায়ে করে ঝাক্কা দিয়ে বসে কৃতি। তীব্র গতিবেগে টাল সামলাতে না পেরে চিত্রিতা সাইকেল সহ পিছলে পড়ে মাঝরাস্তায়। বাসটা তখন একেবারে সামনে। কৃতি পেছনে তাকিয়ে বৃষ্টি, রাইনকোটের প্লাস্টিক ইত্যাদির অস্বচ্ছতায় শুধু এটুকুই দেখতে পায় যে চিতার সাইকেলটা আস্তে আস্তে ঢুকে যাচ্ছে যমদূতের মতো বাসটার সামনের চাকার তলায়। কিছুটা এগিয়েই সজোরে ব্রেক কষার শব্দ পায় কৃতি। সে তখন আর সেখানে নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু দেখার, শোনার, ভাবার, কাজ করার মতো অবস্থায় ছিল না সে। শুধু চেয়েছিল পালিয়ে যেতে। চোখ কান বুজে কোনরকমে পালিয়ে যেতে। তারপর ওখানে কী হয়েছে, কে কীভাবে চিত্রিতাকে বাঁচিয়েছে, আদৌ বাঁচাতে পেরেছে কি না কিছুই জানতে পারেনি কৃতি। আসলে জানতে চায়নি। দ্রুত সাইকেল চালিয়ে বাড়ি পৌঁচেছে। গেট খুলে কোনোমতে সাইকেল ঢুকিয়ে বারান্দায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল সে। সাইকেলটা পড়েছিল এককোণে। স্ট্যান্ড করার মতোও শক্তি ছিল না তার। তাকে হাঁপাতে দেখে মা ছুটে আসে ভেতর থেকে। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলতে পারে না কৃতি। শুধু স্বাভাবিক হবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। 
চিত্রিতার বাড়ির ফোন নাম্বার যদিও মুখস্থ। বেশ কয়েকবার কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনের কাছে গিয়েও ফিরে এসেছে সে। নিজেকেই বারবার বলেছে, যা হয় হোক, কাল স্কুলে গিয়েই শুনবে সব। সন্ধের দীপ্তি মিসের টিউশনটাও আজ বন্ধ। মিস শান্তিনিকেতন গেছেন। থাকলেও কৃতি হয়ত আজ যেতে পারত না। ভয়ে? অনুশোচনায়? আত্মগ্লানিতে...কৃতি কীসের জন্য ছটফট করছে সে নিজেই স্থির করে উঠতে পারছে না। বারবার নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছে, 'না না, চিতার কিছু হয়নি। কিছু হতে পারে না।' পরক্ষণেই ভাবছে, কিছু হয়ে গেলে! কী করবে কৃতি! কোথায় পালাবে? কেউ যদি বলে দেয় পায়ে করে চিত্রিতাকে ঠেলে দেবার কথা! আবার ভাবে, না না কেউ তো দেখতেই পায়নি। কিন্তু...কিন্তু চিত্রিতা! ও তো দেখেছে। ও তো জানে! চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে কৃতির। এমনিতেই সে খুব চাপা স্বভাবের। নিজের দুর্বলতার প্রকাশ সে পারতপক্ষে বাড়ির লোকের সামনে করতেও দ্বিধাবোধ করে। সেদিন বৃষ্টির সন্ধেটা তার এরকমই অসহ্য কেটেছিল। অনেক রাতের দিকে বিছানায় পাশ বালিশ চেপে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।



*
হঠাৎ করে যেন কার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলো কৃতি। ব্যালকনির নিচ থেকে কে যেন ডাকছে। হাতে ঠান্ডা চায়ের কাপটা ধরেই আরেকবার ব্যালকনিতে এলো সে। নিচে পঙ্কজ'দা। তোমার সন্দেশকে দেখে যাও কোথায় আছে। এসো এসো। কৃতিকে দেখেই হাসতে হাসতে বলে ওঠে পঙ্কজ। ব্যস্ত হয়ে স্লিপার গলিয়েই সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত লনে নেমে আসে কৃতি। এপার্টমেন্টের পেছনেদিকে একটা পুরনো বাড়ির পাঁচিল রয়েছে। জায়গাটা অপেক্ষাকৃত উঁচু বলে জল জমে না খুব একটা।  ট্রাউজার হাঁটুর কাছাকাছি তুলে জমা জল কেটে ওই ভাঙা পাঁচিলের লাগোয়া একটা আমগাছের নীচে এসে পৌঁছয় পঙ্কজ ও কৃতি। পঙ্কজ'দা মাঝারি উচ্চতার একটা ডালের দিকে নির্দেশ করে বলে, দেখতে পাচ্ছ ব্যাটাকে? দেখতে পাচ্ছ? ঘুমোচ্ছে দেখে আর তুলে নিয়ে গেলাম না। ভাবলাম তোমাকে ডেকেই দেখাই। কৃতি দেখতে পেলো সন্দেশ গাছের ডালে এক ভিনদেশি ( ভিন পাড়ার) মেনিকে জড়িয়ে ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। হলুদবর্ণ মেনিটিও তাই। কৃতি হাসবে না রাগ করবে না অবাক হবে কিছুই ভেবে পেলো না। পুত্রবধূর সঙ্গে এভাবে পরিচিত হতে হবে এ কৃতি স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ছেলে প্রেম করছে, আর এ কথা কৃতি এক মুহূর্তের জন্যও টের পেল না! এই ভেবেই মনে মনে নিজেকে শতবার ধিক্কার দিল।


***
(চলবে ....)

মন্তব্যসমূহ