ভাবতে পারছিস! সন্দেশ কি না প্রেম করছে! একটা কোথাকার উটকো মেনি...
এই এই, গালি দিবি না। গালি দিবি না একদম, কৃতিকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ফোনের ওদিক থেকে চেঁচিয়ে ওঠে সাম্য।
চুপ কর তো, আমি গালাগালি করি না! পায়ে টোকা মেরে খিঁচিয়ে ওঠে কৃতি।
― তাছাড়া ছেলেও যে মায়ের পথ অনুসরণ করবে এমন তো আর কথা নেই, তাই না!
সাম্যর কথায় কেমন যেন গুম মেরে গেল কৃতি। অন্য সময় হলে রিয়েক্ট করত। সাম্যর খোঁচা খেয়ে পাল্টা খোঁচা দিতে সেও ছাড়ত না। কিন্তু আজ তার মনটা একটু খারাপ। এসব কথা তুলতে তার মোটেই ইচ্ছে করলো না। খানিক চুপ করে থেকে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো, কিন্তু আমার বৌমা'কে দেখতে হেব্বি, জানিস!
তাহলে আর কী! শুভদিন দেখে আট পা এক করে ঘরে তুললেই তো হয়
― হ্যাঁ রে! তারপর ছানা-পোনাগুলোকে তোর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব, কেমন?
― সে কী সুকৃতি! ওরা তোমার নাতি নাতনি না!
সাম্যর কথা বলার কায়দায় সজোরে হেসে ওঠে কৃতি। সাম্য-ও। তারপর একটু ঢোক গিলে সাম্য আবার বলে, আজ একবার বেরবো। অরণ্যা'দির কাছে যেতে হবে। তুই যাবি?
― আজব পাগল তো তুই! এই পরিস্থিতিতে আমি খামোখা কেন যাব। আর তুই-ই বা কেন বেরোবি। বললি তো এখন আউট অফ ডেঞ্জার।"
তবুও একবার, এই বলে সংক্ষেপে শেষ করতে চাইলো সাম্য।
এই, কী কেস বলতো? সিরিয়াস কিছু? ব্যস্ত হয়ে জিগেস করলো কৃতি।
―নাহ, পরে বলবো কখনও।
সন্দেশকে ওই অবস্থাতেই ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিয়ে এসেছিল কৃতি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে সন্দেশ টুঁ শব্দটি করার সুযোগ পায়নি তখন। মেনিটিও একলাফে ডাল থেকে নেমে কোথায় যে পালিয়ে গেল বোঝা গেল না। তারপর থেকে সন্দেশ মুখ ভার করে বিছানার একপাশে বসে আছে। কৃতি ডাকলেও আর তার কাছে যাচ্ছে না। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শুধু। ওরে হতভাগা! গার্লফ্রেন্ডের চক্করে আমাকে মেজাজ দেখানো হচ্ছে! দাঁড়াও আজ তোমার দুধ, দই, মাছ সব বন্ধ। খাও গে যাও যেখানে পারো। সন্দেশ তবুও সাড়া দেয় না। এই শুনতে পাচ্ছিস না আমার কথা? বলতে বলতে হাতের পেনটা সন্দেশের দিকে ছুঁড়ে মারলো কৃতি।
*
এই শুনতে পাচ্ছিস না? উঠবি কি না। আমি ফুল তুলতে যাচ্ছি। এসে যেন দেখি মুখ ধোওয়া হয়ে গেছে, মায়ের গজগজ একটু দূরে যেতেই একচোখ খোলার ভঙ্গিতে টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কৃতি দেখলো পৌনে ছ'টা বেজে গেছে। বাইরের গেটের শব্দ পেলো। মা ফুল তুলতে বেরিয়েছে। বাবার আজীবন মর্নিং শিফ্ট। পাঁচটা কুড়িতে বেরিয়ে যান। ওই সময়ই কৃতির ওঠার কথা রোজ। গতকাল দেরি করে ঘুমিয়েছে বলে ঘুম ভাঙেনি। মা না ডেকে গেলে হয়ত ভাঙতোও না। পাশ বালিশ জড়িয়ে ধরে আরেকটু ঘুমোবার ইচ্ছে হল তার। গতকালের কথা ততক্ষণে কিছু মনে নেই। হঠাৎ খেয়াল পড়তেই বিছানা থেকে হুড়মুড় করে নেমে টয়লেটের দিকে ছুটে যায় সে। ছটা পনেরোয় চিতাদের ডাকতে আসার কথা। যদিও রোজ কৃতিই আগে তৈরি হয়ে গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চিত্রিতা আর পৌলমী আসে তাকে ডাকতে। তারপর তিনজন একসঙ্গে স্কুলে যায়। এই তো রোজকার রুটিন তাদের। কিন্তু আজ! আজ কে ডাকতে আসবে! মুখে জল দিতে দিতে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যেতে থাকে কৃতি। বেসিনের আয়নায় নিজেকে দেখে শিউরে ওঠে। আয়নার প্রতিবিম্ব যদিও বারবার বলে, 'ইটস জাস্ট এ গেম কৃতি। একটা ভুল মাত্র। কেউ জানে না!"
চিতা জানে, মনে মনেই আওড়ায় কৃতি। আয়না থেকে মুখ সরিয়ে স্কুল ড্রেস নিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়ে। সময় পেরিয়ে গেলেও আর বেরোবার সাহস হয় না তার। মা এতক্ষণে ফিরে এসে দুধ গরম করছে। কর্ণফ্লেক্স খেয়ে স্কুল বেরোয় কৃতি। ঘড়িতে এখন প্রায় ছটা পাঁচ। মায়ের চিৎকার শুনে আরোই ছটফট করতে থাকে ও। আজ কি স্কুল যাবে না, কীই বা বাহানা বানাবে। পেটে ব্যথা, মাথা ব্যথা কিছুই তো মা বিশ্বাস করতে চায় না। এখন তো পিরিয়ডেরও ডেট নয়! এমনিতেও এসব বলে স্কুল কামাই করে না কখনও কৃতি। সে স্কুল অন্ত প্রাণ। শুধু সে কেন! চিতা, পোলো...আবার চিতার কথায় গলা শুকিয়ে আসে তার। অবশেষে কিছুটা খেয়ে কিছুটা ফেলে ব্যাগ কাঁধে সাইকেলটাকে টানতে টানতে বার করে উঠোনে। পোলো বেশ কিছুক্ষণ হল এসে দাঁড়িয়েছে। চুপচাপ রাস্তার দিকে মুখ করে একপা মাটিতে রেখে সাইকেলে চেপে আছে। বেল-ও বাজায়নি। সাধারণত আগে পৌঁছলে বেলটা চিতাই বাজায়। বেরোতে বেরোতে কৃতি একবার মুখ তুলে তাকায় পোলোর দিকে। পুরো রাস্তা আর কোনো কথা হয় না দুজনের। তিনজনের ঘর যদিও তিন দিকে। তবুও তারা একসঙ্গে মিলিত হয়েই স্কুল যাওয়া আসা করে। সেই ক্লাস সিক্স থেকেই। কৃতি সাইকেল শিখেছিল ওদের শেখার অনেক পরে। তাই ওদের কাজ ছিল কৃতিকে সামলে নিয়ে যাওয়া। সেই কাজ এখনও করে চলেছে দুজনে। পোলোর বাড়ি সবচেয়ে দূর। সে প্রথমে চিতাকে ডাকে। তারপর দুজনে কৃতিকে। রাস্তায় আরো কয়েকজন জুটে যায় এই নতুন স্কুলে আসার পরে। আজ অবশ্য কেউ ছিল না। নীরবে দুজনে পাশাপাশি প্যাডেল করছিল। যেন কারোরই কোন উদ্দেশ্য নেই। যন্ত্রের মতো চলে যাওয়া ছাড়া। রাস্তার ঠিক যে জায়গায় কালকের ঘটনাটা ঘটেছিল সে অংশটুকু পেরোতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে কৃতি। মাঝ রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে খুঁজতে থাকে কী যেন। রক্তের দাগ কি? সে তো থাকার কথা না। কাল সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে। দাগ থাকলেও সবটুকু ধুয়ে যাবার কথা। এসব ভাবতে ভাবতেই থরথর করে কাঁপতে থাকে সে। সাইকেল থেকে নেমে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে রাস্তাটার দিকে। এমন সময় হঠাৎ পোলো এসে তার কাঁধে একটা হাত রাখে। অস্ফুটে বলে, চিতা ভালো আছে রে। কিছু হয়নি। পায়ে অবশ্য মাইল্ড ফ্র্যাকচার বলছে ডাক্তার। আর চোখের উপরে পাঁচ-ছটা স্টিচ পড়েছে। ঘরেই আছে। আজ প্লাস্টার হবে। আমি অবশ্য ঘরে ঢোকার সময় পাইনি, ফেরার পথে যাব। কী রে, যাবি তো? কৃতির আর কোনো কথাই কানে ঢুকছিল না। দুহাতের তালুতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে ও। সাইকেলটা ধপাস করে পড়ে যায় রাস্তার মাঝে। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে আর চিত্রিতার বাড়ি যাওয়া হয়নি কৃতির। গিয়েছিল বিকেলের দিকে। টিউশন ফেরত। কৃতি, পৌলমী এবং আরও দুয়েকজন। ঠিক চিত্রিতার বাড়ি বলা যায় না, বাড়ি ওর পিসির। চিত্রিতার বাড়ি বাঁকুড়ার কোনো এক গ্রামে। চিত্রিতা ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্রী। গ্রামে পড়াশুনার সুযোগ ভালো নেই বলে পিসি এখানে এনে রেখেছে তাকে। পিসির এক ছেলে এক মেয়ে। দুজনেই পড়াশুনা ও বিবাহসূত্রে দুর্গাপুরের বাইরে থাকে। তাই একা থাকার চাইতে পিসি পিসেমশাইয়েরও একটা অবলম্বন তৈরি হয় চিত্রিতাকে ঘিরে। তারা তাকে মা-বাবার থেকে কোনো অংশে কম যত্ন করেন না। এ কৃতিরা তার বাড়ি গেলেই টের পায়। সেদিন পিসির বাড়িতে ঢুকেই দেখে বিছানার একপাশে পায়ে প্লাস্টার মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে চিতা। কৃতিদের ঢুকতে দেখেই একটু নড়ে চড়ে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে সে। পিসি এসে পিঠ ধরে তুলে দেয়। কৃতি সামনের সোফার এককোণে মাথা নিচু করে বসে থাকে অনেক্ষণ। উপস্থিত সবারই কথা কানে আসে। অথবা আসে না। তারা ধরে নিয়েছে ঘটনার আকস্মিকতায় কৃতি মানসিক আঘাত পেয়েছে। হবেও বা তাই। সেদিন ভাগ্যক্রমে বাসটাকে ঠিক সময়ে ব্রেক কষে থামাতে পেরেছিল ড্রাইভার। তারপর কন্ডাক্টার, খালাসি ওরাই নেমে সাইকেল সহ চিত্রিতাকে বাসের তলা থেকে বাইরে বের করে আনে। বাসের কিছু যাত্রীও নেমে এসেছিল। পোলো আর বাকি দুজন তখনও কিছুটা দূরে। পৌঁছতে পৌঁছতেই দেখে চিত্রিতাকে রাস্তার ধারে বসানো হয়েছে। সাইকেলের সামনের চাকাটা ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে গেছে। চিত্রিতার যতটুকু লেগেছে ওই পিছলে পড়ে যাবার কারণেই। সাইকেলটাই শুধু বাসের তলায় ঢুকে গেছিল। কপালের কাছ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, পোলোরা দেখেছে। তারপর লোকাল হেলথ সেন্টার, মেইন হসপিটাল। মাথায় স্টিচ করে পায়ের এক্সরে করতে বলেই ছেড়ে দেওয়া হয় মেইন হসপিটাল থেকে। পিসেমশাইয়ের ভাগ্যিস সেদিন বি-শিফ্ট ডিউটি ছিল। ঘরেই ছিলেন। পোলোরা গিয়ে খবর দিয়ে আসে যে চিত্রিতাকে হেলথ সেন্টার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেদিন সবার সঙ্গে বেরিয়ে আসার পর-ও কৃতি একবার ছুটে গিয়েছিল চিত্রিতার কাছে। তার আজন্ম লালিত অহংবোধ ভেঙে সে ক্ষমাটুকু চাইতে পারেনি যদিও কোনোভাবেই। শুধু হাতের উপর একবার হাত রেখেছিল। চিতা কিছু বলেনি। ওর মুখ যেন ভাবলেশ হীন। চোখের কোনো ভাষাই পড়তে পারেনি কৃতি। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে থেকে উঠে আসে ধীরে ধীরে। কৃতির উঠে দাঁড়াতেই চিত্রিতা অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চেয়েও চুপ করে যায়। কৃতিরও আর শোনার মতো মনের জোর ছিল না। দ্রুত পায়ে সে বাইরে বাকি বন্ধুদের কাছে ফিরে আসে। সেদিনের পর আর তার দেখা হয়নি চিত্রিতার সঙ্গে। একটু সুস্থ হতেই বাবা এসে তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। পোলোর মুখে শুনেছে চিতা নাকি আর ফিরে আসতে চায় না। ফোনে মাঝে মধ্যে কথা হয় দুজনের। নোটস, টিউশন এসবের জন্য যোগাযোগ রেখেছে সে। বাকি স্কুল কর্তৃপক্ষর সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। নাইন তো শেষ হয়েই এলো। এমনিতেই নব্বই দিনের আগে আর সে স্কুলে আসতে পারবে না। টেনের পরীক্ষাগুলো শুধু এসে দিয়ে গেলেই হবে। অ্যাটেন্ডেন্সর ঝামেলা নেই। পোলোই হঠাৎ বলেছিল, কেন, তোকে ফোন করে না চিতা? তুইও করিস না? সে কী রে! না, মানে আর করা হয়নি, আমতা আমতা করে জবাব দেয় কৃতি। এরপরও পরীক্ষাসূত্রে বা পড়ার কাজে চিত্রিতা বেশ কয়েকবার দুর্গাপুর এসেছিল। কিন্তু কৃতির সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ বা দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। তিনজনের এত গাঢ় একটা বন্ধুত্ব হঠাৎ করে কৃতির একটা ভুলেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ভুল! অন্যায়! না কি এটাই কৃতি। এটাই মিস সুকৃতি আচার্য্যর প্রকৃত পরিচয়! ক্রোধ, অভিমানকে সে সম্বরণ করতে পারে না কিছুতেই। স্থান, কাল, পাত্রের পার্থক্যজ্ঞান লোপ পায় সেই মুহূর্তে। নিজেকে নিজেই ভীষণ রকম ভয় পায় কৃতি এই কারণেই। অবিশ্বাস করে। সত্যি স্বীকার করার ক্ষমতা তার নেই। এড়িয়ে চলতে চায় সে সুকৃতির এই পরিচিতি। পালিয়ে বেড়াতে চায় প্রতিবার। তবুও কোনো না কোনো অছিলায় তা আয়নার মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। আজ যেমন দাঁড়িয়েছে। ফেলে আসা দিন, ভুল আচরণ ― এসব মনে করে মনে মনে আরো বেশি অস্থির হয়ে ওঠে ও। সন্দেশের দিকে তাকিয়ে গজগজ করে ওঠে, আমাকে ফেলে তুই এমন করে যেতে পারলি! আর কখনও গেছিস তো তোকে ওখানেই রেখে দিয়ে আসবো, দেখিস।
***
(চলবে ...)
মন্তব্যসমূহ