সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উপন্যাস — কোকুন ( প্রথম পর্ব ) ৫

"শূন্যে ছোরা মেরে দুটো পাখি উড়ে যায়
সময়মতন ঘুম ভেঙেছিল বলে
মানুষ দেখতে পায় জানালার বাহিরে প্রকৃতি ―
'কী যেন করার ছিল, কী যেন করার ছিল'
― এই ভয় তাকে তাড়া করে"

পাঁচ তলার এই জানালাটা থেকে বড় বড় বিল্ডিং আর গুচ্ছের উড়ালপুল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। উপরে অসহ্য নীল একটা আকাশ। বিপদের মেঘ সরে আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে সবে। উড়ালপুলগুলো প্রায় ফাঁকা। না আছে যানজট, না আছে অহরহ গাড়ির হর্ন। হালকা সবুজ রঙের সুগন্ধি ছড়ানো পর্দাটা একটু সরিয়ে কাচের জানালাটা খোলার চেষ্টা করছিল গোলাপি পোশাক পরা কম বয়সী নার্সটি। অরণ্যা আজ একটু উঠে বসতে পেরেছে। সকালেই কেবিনের এ.সি বন্ধ করিয়ে জানালাটা খোলার আর্জি জানিয়েছিল রুটিন চেকাপে আসা নার্সটিকে। তার বোধয় ডিউটি আওয়ার শেষ হয়েছে। এই মেয়েটি নতুন। মুখে মাস্ক, টুপি আর সারা শরীর পি.পি.ই কিটে ঢাকা অবস্থায় বয়স চেহারা কিছুই ঠিকমতো আঁচ করা যায় না। অনেক্ষণ গভীর অন্বেষণের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অরণ্যা তার দিকে। মেয়েটি নিজের কাজ সেরে বেরিয়েই যাচ্ছিল এমন সময় অরণ্যা তাকে পিছু ডেকে বসলো।  আজ একটু গল্প করতে ইচ্ছে করছে তার। প্রায় তিনদিন এই বেডে একইভাবে মড়ার মতো পড়ে থেকেছে সে। জ্ঞান যে ছিল না তা নয়। জ্ঞান তো প্রায় পরেরদিন সকালেই ফিরে এসেছিল। কিন্তু ওঠার ক্ষমতা ছিল না। কথা বলার, সাড়া দেবার শক্তি জুগিয়ে উঠতে পারেনি। আজ খুব ভোরের দিকে ঘুম ভেঙেছে। এই তিনদিন শহরের উপর দিয়ে যে কী বয়ে গেছে, পাঁচতলার এ.সি কেবিনে পিন পতন শুনতে পাবার মতো গুমোট নীরবতায় কেবল যন্ত্রের টিকটিক শব্দে, (তাও অবশ্য তার নিজের হৃদযন্ত্রেরই প্রতিধ্বনি ) বাইরে কী ঘটেছে বোঝা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কিছু যে হয়েছে তা আঁচ করতে পারা অসম্ভব না। আর এমনিতেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস তো বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই দেখে আসছিল অরণ্যা। টিভি চ্যানেলগুলোতে মুহুর্মুহু বিশ্লেষণ, সাবধানবাণী ইত্যাদি। আজ সকালে ফেসবুক খুলেছে প্রায় সাতদিন পর। খোলা মাত্রই ঝড়ের গতিবেগে প্রায় শ'খানেক মেসেজ ঢুকতে শুরু করে ইনবক্সে। নিকট বন্ধুবান্ধব, ছাত্র-ছাত্রীরা হোয়্যাটসেপেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে এ কদিন। বিষয়টা যে আর জানতে কারো বাকি নেই, এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত হয়ে যায় অরণ্যা। সমগ্র নিউজফিড জুড়ে শুধু ঝড়ের খবর, ঝড়ের অভিজ্ঞতা। গাছ ভেঙে পড়া, চাল উপড়ে পড়ার ছবি, ভিডিও আর কোভিড আক্রান্তের পরিসংখ্যান। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তার। জলের বোতল খুলে ঢকঢক করে অনেকখানি জল খেয়ে নেয়। তারপরই গুম মেরে বসে থাকে কিছুটা সময়। তখনই নার্সটির আচমকা অথচ অভিপ্রেত আগমনে একটু বিচলিত হয়ে ওঠে সে। পিছুডাক শুনে মেয়েটি ফিরে আসে বেডের কাছে। হাসিমুখে ( মাস্কের ভিতর থেকে কন্ঠস্বর শুনে যতটা বোঝা যায় আর কী) জিগেস করলো, কিছু লাগবে ম্যাডাম?
― আচ্ছা এখানে ভিজিটিং আওয়ার্স কটা থেকে?
― এই তো, সাড়ে নটায় শুরু হয়ে যাবে
ফোন অন করে দেখলো পৌনে ন'টা বাজে সবে। ঠিকঠাক জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ভিজিটিং আওয়ারে কাউকে আসতে দেখেনি অরণ্যা। যদিও জানে কারা তাকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে এসেছে ও ভর্তির ব্যবস্থা করেছে। বাকি কথা ডাক্তারের সঙ্গে হয়েছে তার। তবুও পরিচিত কাউকে, কাছের কাউকে আজ বড় দেখতে ইচ্ছে করছিল। এখন কেমন আছে সে, কবেই বা ছুটি হবে এসব কথাও কিছু জানায়নি কেউ। মনে মনে ঠিক করলো, ডাক্তার ভিজিটে এলে আজ সব ভালো করে জিগেস করে নেবে আর অনুরোধ করবে যাতে তাড়াতাড়ি রিলিজের ব্যবস্থা করে। নিজের একান্ত আস্তানায় ফিরে যেতে চায় সে। ভাবতে ভাবতেই মাথার ব্যান্ডেজটায় অজান্তেই হঠাৎ হাত চলে যায় অরণ্যার। পেছনেদিকে হাত রাখলে এখনও বেশ ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। কুনুইয়েও সামান্য। ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বাড়াবাড়ি টের পাচ্ছে না। অরণ্যাকে মাথা নিচু করে কীসব ভাবতে দেখে মেয়েটি আবার প্রশ্ন করলো, কিছু বলবেন ম্যাম?
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অরণ্যা সংক্ষেপে বলে, না!
―বেশ, আপনি তাহলে রেডি হয়ে থাকুন। ওষুধ দিয়ে গেলাম। ন'টায় ব্রেকফাস্ট আনছি
অরণ্যা একটু অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। হ্যাঁ ম্যাডাম, এই তিনদিন তো সেলাইনে চললো। আজ সলিড খাবার দেবার কথা বলে গেছেন ডক্টর।
― আচ্ছা, আর কি কিছু বলেছেন? ব্যস্ত হয়ে জিগেস করে অরণ্যা।
― তা তো জানি না, আমার কাছে এটুকুই ইন্সট্রাকশন আছে আপাতত
আর কিছু বলে না অরণ্যা। মেয়েটিও দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। হাঁটার সময় পি.পি.ই কিটের ঘর্ষণের শব্দ মিলিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। এবং আবার নীরবতা। জানালার বাইরে দুটো নীল রঙের পাখি এসে বসেছে। কাচের ওপার থেকে তাদের চঞ্চলতা টের পাওয়া যাচ্ছে। অরণ্যার উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু পেরে উঠলো না। অগত্যা দূর থেকে পাখিটিকে দেখতে লাগলো খানিক্ষণ ধরে। তারপর প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কথায় 'শূন্যে ছোরা মেরে দিয়ে পাখি উড়ে যায়॥' কী যেন করার ছিল ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে অরণ্যা। ইতিমধ্যে চারটে টোস্ট, বাটার, টক দই ইত্যাদি খেয়েছে সে। ওষুধের পর আধ গ্লাস মতো জল। বসে বসেই বালিশে হ্যালান দিয়ে একটা বইয়ের পি.ডি. এফ খুলেছে এখন। এমনিতে তার পিডিএফ পড়তে ভারী আপত্তি। কিন্তু অসময়ে এর কার্যকারিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এরিক ফান দানিকেনের 'দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ' বইটির একটি সুপাঠ্য অনুবাদ পড়তে শুরু করেছিল অরণ্যা, এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সাম্যব্রত ও রাতুল। ওদের দুজনকে দেখে অরণ্যা যেন অনেকখানি স্বস্তি পায়। ফোন পাশে রেখে পিঠ টান টান করে বসে।  সামনের টুলটা বসার জন্য টেনে নেয় সাম্য।  রাতুল গিয়ে বসে দেওয়াল লাগোয়া কাউচটার উপর। সাম্য কিছু একটা বলতেই যাবে, এমন সময় তাকে কার্যত থামিয়ে দিয়ে অরণ্যাই বলে ওঠে, ধন্যবাদ দিলে কি তোরা নিবি?
― হ্যাঁ, মানে কবিতার নীচে কমেন্টের রিপ্লাইয়ে যত ইচ্ছে ধন্যবাদ জানাতে পারো, তবে এখানে একেবারেই নয়। একটু হাসার চেষ্টা করে সাম্য। অরণ্যা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলে, তোরা সেদিন না থাকলে আমি হয়ত বেঁচে ফিরতাম না...
― আমরা না থাকলে অন্য কেউ থাকত।
আবার দীর্ঘশ্বাস। তারপর একটা ঢোঁক গিলে অরণ্যা জানতে চায়, আমায় ছাড়বে কবে রে?
― সম্ভবত কাল। আজ আরেকটা স্ক্যান বাকি আছে। ওটা করেই ছেড়ে দেবার কথা। কমপ্লিকেশন তো আর কিছু নেই। যাক গে, তুমি এখন কেমন ফিল করছো বলো। প্রশ্নটা করে নিজেই একটু অপ্রস্তুতে পড়ে যায় সাম্য। ওদিক থেকে সরাসরি উত্তরের আশা না করেই আবার বলতে শুরু করে, দুদিন আসতে পারিনি গো। একেই রাস্তা ঘাটের খুব খারাপ অবস্থা। প্রপার রিজন না দেখালে বাইক আটকে দিচ্ছে সাউথের দিকটায়। তাছাড়া বাড়ির পাশের বস্তিতে একটু রিলিফের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
― আরে! তোদের এমনিতেও এতটা রাস্তা আসা উচিত হয়নি। খুব সাবধানে থাকবি বাবু। নিজে সুস্থ থাকতে পারলেই বাকি কাজ করতে পারবি।
কিছু না বলেই মাথা নাড়ে সাম্য। 
― আচ্ছা, এখন তো কলেজ বন্ধ। খুলবে যে তার সম্ভাবনাও কম। আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। হ্যাঁ রে, গাড়ি পাওয়া যাবে এখন?
ওদিক থেকে রাতুল বেশ জোর গলাতেই বলে ওঠে, এখন একটা গাড়িও পাবে না। কেউ যেতেই চাইছে না। তারপর রাস্তায় প্রচুর ধরপাকড় হচ্ছে। আরে সেই পরিযায়ী শ্রমিকেরা ফিরছে তো। একেবারে বিচ্ছিরি অবস্থা। তুমি কলকাতার বাইরে বেরোতে পারবেই না
অরণ্যার বর্তমান মানসিক অবস্থা সাম্য জানে। রাতুল যে জানে না তেমন নয়, কিন্তু অনুভব করতে পারে কম। অরণ্যাদি'র পক্ষে যে আর যাদবপুরের ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, এটা সাম্য বিলক্ষণ জানে। এরকমই আগাম কিছু একটা আঁচ করে কয়েকজন পরিচিতকে বলে অন্য বাড়ি ভাঁড়ারও খোঁজ শুরু করেছে সে। আজকে সেটা বলতেই বিশেষ করে আসা। কিন্তু অরণ্যা'দিই যখন আগ বাড়িয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাইছে, সাম্য আর কথা বাড়াতে চায়নি। যদিও ও বাড়িতেও তাকে একাই থাকতে হবে, যতদূর জানে সাম্য। তবুও নিজের বাড়ি তো! এখানে যদিও যাদবপুরের ফ্ল্যাটের ই.এম.আই দুজনেই শেয়ার করত। দুজনে মানে অংশু'দা আর অরণ্যা'দি। সেক্ষেত্রে এখানেও তার সমান অধিকার থাকবার কথা। কিন্তু যা ঘটে গেল, তারপর আর বোধয় অসম্ভব ওই ফ্ল্যাটে থাকা। তাছাড়া অংশুদা'ও যে কোনো সময় ফিরে আসতে পারে। এসবই সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মধ্য চল্লিশের অরণ্যা প্রধানের তীক্ষ্ণ অথচ ম্লান চোখের দিকে তাকিয়ে একটু বিচলিত হল সাম্য। 
 অ্যাম্বুলেন্স তো রাজি হবে, না কি! রাতুলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই।
রাতুলকে ইশারায় চুপ করতে বলে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো তারপর। কৃতির সঙ্গে ফোনে কথা বলা প্রয়োজন একবার। ওদিকে কৃতির স্বর পেয়ে সাম্য চাপা গলায় বললো, শোন না, আর্জেন্ট একটা এরেনজমেন্ট করতে হবে। এই মুহূর্তে তুই ছাড়া কাউকে জাস্ট ভাবতে পারছি না।
*

(চলবে ....)

মন্তব্যসমূহ