সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উপন্যাস — কোকুন ( প্রথম পর্ব ) ৬


"অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি"
বিনয় না? বিছানার এককোণ থেকে একটু ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করলো কৃতি। শেষ বিকেলের আলোয় তখন বিছানার যে অংশটা জানালার লাগোয়া, সেখানটা আলো হয়ে আছে। বাকি অংশে ছায়া পড়েছে পর্দার। সেই আংশিক আলোতেই ছোট্ট বইটার একটি পাতা খোলা। ফ্যানের হাওয়ায় উড়ছিল চাপা স্বরে। জানালায় রাখা মানি প্ল্যান্টের শৌখিন ছায়া পড়েছে তার উপর। সেও যেন বাইরের বাতাসে দুলে দুলে উঠছে। অরণ্যার মুখের যে অংশে আলো পড়েছে, তা সোনার বর্ণ মনে হচ্ছে যেন। বিদায়ী রোদ লেগে ঘামে চিকচিক করছে কপালের একদিক। বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে কৃতির দিকে ঘুরে তাকালো সে। বুকের কাছে বালিশ নিয়ে হাতের ভরে এতক্ষণ বইয়ের উপরে ঝুঁকে পড়েছিল। কৃতির প্রশ্ন শুনে আনমনে বললো, হুম, ফিরে এসো চাকা। পড়েছ?
― নাহ, বইটা নেই কাছে। কিছু বিক্ষিপ্ত লেখা পড়েছি। হয়ত সবগুলোই। তবে বিক্ষিপ্তভাবে।
অরণ্যা মাথা নেড়ে বলে, ধর্মগ্রন্থ বোঝ?
কৃতি শিরদাঁড়া সোজা করে সংজ্ঞা বলবার ভঙ্গিতে বললো, হ্যাঁ! যা পড়ে নিজের অস্ত্বিত্ব সম্পর্কে ধারণা জন্মায়
―কার্ল মার্কসের দ্য ক্যাপিটাল কারো কারো ধর্মগ্রন্থ
―ঠিকই। সাত্রে অথবা হেগেলের তত্ত্বও, অরণ্যার কথার সঙ্গে যোগ করলো কৃতি।
― একই অজুহাতে বিনয় অথবা জীবনানন্দ, বোদল্যয়ার ― এঁদের লেখা আমার কাছে ধর্মগ্রন্থর মতো।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো কৃতি। ওম টওয়ারের চতুর্থ তলে পশ্চিমের ফ্ল্যাটের শোবার ঘরে তখন বেলা পড়ে আসছে নিয়তি মেনে। লকডাউনের সময়সীমা যখন দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, অরণ্যার আর বাড়ি ফিরে যাওয়া হয়নি। কলকাতাতে না থাকলে অনেক কাজও আটকে যেত। সে কারণেই কৃতির সাহায্যে বেশ কয়েকদিন কাঠ-খড় পোড়ানোর পর ওর এপারমেন্টেরই চার তলায় একটা ফ্ল্যাটে ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া গেছে। অতিমারী পরিস্থিতির জন্য ভাড়া হিসেবে কিছু অতিরিক্ত অর্থই গুণতে হবে অবশ্য অরণ্যাকে। খুব সামান্য আসবাব সহ সাম্যরাই কয়েকজন মিলে তাকে একপ্রকার কৃতির জিম্মায় রেখে দিয়ে গেছে। কৃতি প্রথমে ভীষণরকম আপত্তি জানিয়েছিল। দেখাশোনা ইত্যাদির দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে কৃতি যেন একটু একটু করে জড়িয়ে পড়ছে মানুষটার সঙ্গে। দেড়মাস আগে, অরণ্যা যখন প্রথম প্রথম ফ্ল্যাটে এসেছে তখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। বিশেষত মানসিক অবসাদের সমস্যাটা প্রবল ছিল। কৃতির সে সময় যথেষ্ট অস্বস্তি হত। এমনিতেই অনেকদিন একা একা নিজের দায়িত্বে নিজের মতো থাকতে থাকতে নতুন কারোর উপস্থিতি মেনে নিতে তাকে একটু বেগ পেতে হয়। অথচ দেখা যাচ্ছে সুস্থ হতে হতে এই মানুষটিই যেন কৃতির স্থানীয় অভিভাবক হয়ে উঠছে। কৃতিও দ্বিধা দ্বন্দ্বে একপ্রকার মেনে নিচ্ছে সে অভিভাবকত্ব। অরণ্যা নিজের কাজ নিজে করতেই পছন্দ করে। অভ্যস্তও। কয়েকদিন নাজিয়া এসে একটু আধটু সাহায্য করে গেছে। নিজেকে মানসিক ভাবে সুস্থ মনে করার পর থেকেই সে নাজিয়াকে বিদায় দিয়েছে। কৃতিও তাতে খানিক হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। বিকেলের চা'টা ওরা দুজন একসঙ্গে পান করে আজকাল। এই বিছানাতে বসেই দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয় না না বিষয়ের। কখনও নিছকই আড্ডা, ও.টি.টি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখা, গান শোনা। এরই মাঝে হুট করে না চাইতেই ঢুকে পড়ে স্মৃতি, অতীত জাতীয় অস্বস্তিকর বিষয়গুলো। দুজনেই তখন সংযত করে নিজেদেরকে। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে যায় খানিকটা জোর করেই। কখনো কখনো আলোচনায় ছেদ পড়ে যায়। কৃতি ফিরে আসে নিজের ঘরে। তবে আজকের আলোচনাটা বেশ আগ্রহপূর্ণ মনে হল কৃতির। অরণ্যা উঠে গেছে চা তৈরি করতে রান্নাঘরে। কৃতি বিছানায় একই কোণে একইভাবে বসে বসে ভাবছিলো কতরকম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এই মহিলার। কবি-সাহিত্যিকরা বুঝি এমনই হয়। অথবা এমন হওয়ার ভান করে। নিজের কাছেও আর সংশ্লিষ্ট মানুষগুলির কাছেও। তবে কৃতি তো আর তেমন নয়। তার কোনো ভণিতা নেই। তাই সে খুব স্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা করে অরণ্যাকে। মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে নিজের সঙ্গে। এই সময়টুকুর মধ্যে দুজনেরই অস্তিত্ব আলাদা। মূল্যবোধও এক নয়। গন্তব্যও হয়ত। তবুও সে আপেক্ষিক একটা দৃষ্টি গড়তে চেষ্টা করে। অরণ্যার চোখে সে ঠিক কীরকম, দেখতে ইচ্ছে করে তার। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই রান্নাঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কৃতি। দেওয়ালের একপাশে হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অরণ্যার দিকে। একটা ঢোঁক গিলে সে বললো, সাত্রে বলেছিলেন "এসেন্স ইজ দ্য ডিফাইনেবল নেচার অব দ্য থিং দ্যাট এক্সিস্টস"একটু থেমে বলে, এই এসেন্স আর অস্তিত্ব সম্পর্কে তোমার বিনয় বা জীবনানন্দ কী বলেন? ইন্ডাকশন ওভেন থেকে প্যান নামাতে নামাতে কৃতির দিকে না তাকিয়েই অরণ্যা বলে, তাঁরা তো দার্শনিক নন! বলতে বলতে অরণ্যা একটু হাসার চেষ্টা করলো মনে হল কৃতির। সেও বিদ্রোহের সুরে বললো, কবিরা দর্শন নিয়ে মাথা ঘামায় না বলছ?
― সব কবির কথা তো জানি না সুকৃতি, তবে ওঁদের প্রতিটি শব্দই দর্শন একপ্রকার। বরোসিলের কাপে চা ঢালতে ঢালতে অরণ্যা বলে চললো, "যা হবে তা আজকের নরনারীদের নিয়ে হবে, যা হলো তা কালকের মৃতদের নিয়ে হয়ে গেছে"....একেও রিলেটিভ ট্রুথ বা সময়ের সত্যের সঙ্গে কল্পনা করতে পারো তো
চায়ের কাপের শরীরে প্রবেশের শব্দের মধ্যেই অরণ্যার কথাগুলো শুনছিলো কৃতি। সতর্ক হয়ে বলল, কন্ট্রেডিক্টরী মনে হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে...
হ্যাঁ, আছে আরো। আলোচনায় বসলে এমন বেশ কয়েক কাপ চা লাগবে, বুঝেছ? বলতে বলতে ট্রে হাতে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় অরণ্যা। কৃতিও পিছু নেয়। ধোঁয়া ওঠা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলে, তোমার মুখে কবিতা শুনতে ভালো লাগে
― কিন্তু তোমার মুখে দর্শনচিন্তা একেবারেই ভালো লাগে না
অরণ্যার আকস্মিক মন্তব্যে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল কৃতি। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জীভও পুড়লো খানিক। তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকালো অরণ্যার দিকে। দেখলো অরণ্যা তারই দিকে তাকিয়ে আছে। একটু হেসেই সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল, কারণ জানতে চাইছ না যে বড়!
― অনুমান করতে পারছি
― কীরকম?
― দর্শনচিন্তাকে দর্শনচর্চায় উপনীত করতে পারিনি
এবার সশব্দে হেসে উঠলো দুজনেই। আমার এক্টিভিটি তবে বেশ লক্ষ্য করা হয়! চায়ে চুমুক দিতে দিতেই বললো কৃতি।
― তাই! আমি তো ভাবতাম ব্যাপারটা উভয়পক্ষেরই!
এবার একটু অপ্রস্তুতে পরে গেল কৃতি। বললো, নাহ, তোমার সঙ্গ উপভোগ করতে শুরু করেছি ইদানিং। এই অকপট স্বীকারোক্তির মধ্যে কিন্তু কোনো ভণিতা নেই!
― করবে বলে ভাবোনি, তাই তো? উত্তর দিতে চায়নি কৃতি। বরং অরণ্যাই অপেক্ষা না করে বলে চলে, "অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো, দ্বিপাতিত লক্ষ্যে এই চলে যাওয়া..." আজ হয়ত তার এসব নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে হয়েছে। বাধা দিতে চাইছে না কৃতিও। অরণ্যা বলে চলে, এসব কবিতা একসময় দুজনে একসঙ্গে আওড়াতাম। উদাত্ত কন্ঠে। সেই অভ্যেসটাই রয়ে গেছে।
― অভ্যেস খুব একটা গঠনমূলক বিষয় না। মানুষকে টেনে ধরে রাখে। এগোতে দেয় না। অভ্যেস পাল্টে ফেলাই বুঝি একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত
― এও কি সাত্রের বক্তব্য?
― নাহ! এটা সুকৃতি আচার্য্যর উপলব্ধি। তারপর দুজনে কিছুক্ষণ একপ্রকার মৌনব্রত অবলম্বন করে রইলো। বিষয়ভিত্তিক কিছুই বলার থাকে না এসব আলোচনার পর। অনুভূতির কথা, উপলব্ধির কথা বলা চলে অবশ্য। কিন্তু কেউই আর শুরু করবার সাহস করে না। কৃতি জানলার দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে। এদিকের থেকে বড় রাস্তা দেখা যায় না। পেছনের পাড়ার গলি, ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে একটা মজা পুকুরের কিছুটা অংশ দেখা যায়। ওই জলেই রাস্তার টিমটিমে আলোর প্রতিবিম্ব কেঁপে কেঁপে উঠছে। অরণ্যা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে, অংশুপ্রতিমকে চেনো তুমি?
কৃতি চোখ না ফিরিয়েই বলে, হ্যাঁ, ওই সাম্যর মুখেই শুনেছি ওনার কথা
― ভীষণ ভালোবাসে ছেলেটা অংশুকে।
― গুণমুগ্ধও। একটু থেমে আবার বলে কৃতি, মানে ছিল
― তাহলে এই 'ছিল' হয়ে যাবার মূলে আমিই রয়ে গেলাম! 
― কিছুই তো স্থায়ী নয় অরণ্যা'দি। এই যে রিলেটিভ ট্রুথ ব্যাপারটা। সেও তো সময়ের হাত ধরেই। ওই সময়ে ওই টাইম স্প্যানে যা সত্য ছিল তা এখন নাও হতে পারে। আবার এখন যা সত্য তা হয়ত ভবিষ্যতে থাকবে না। এক মুহূর্তের সত্যটুকুই তো সব
― এ কথা তুমি নিজে বিশ্বাস করো? কৃতির কাছাকাছি এসে ওর কাঁধে একটা হাত রেখে প্রশ্ন করে অরণ্যা। চমকে ওঠে কৃতি। হয়ত একটু শিউরেও ওঠে। এই কয়েকদিনে প্রথম অরণ্যা তার এত কাছাকাছি এসেছে। পারতপক্ষে কাউকে কাঁধে স্পর্শ করতে দেয় না কৃতি। অসাবধানে বা প্রয়োজনে কেউ করে ফেললে যথেষ্ট অস্বস্তিকর মনে হয় ওর। এই মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া দিতে না পেরে একটু জড়তা নিয়েই সে বলে, হয়ত করতাম না, তবে শিখেছি। শিখছি।
কৃতিকে আরও চমকে দিয়ে অরণ্যা আবার প্রশ্ন করে বসে, মুহূর্তের ধারণা কি মুহূর্ত থেকে পালিয়ে যাবার অজুহাত নয়?
কৃতি কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। চুপ করে থাকে। অরণ্যা বলে চলে, পালিয়ে বেরিয়েছ কখনও মুহূর্ত থেকে? যে মুহূর্তে যা করার, করতে পেরেছ? তোমার কি মনে হয় না, আমি নিজেই সত্যকে একসেপ্ট করতে পারছি না বলে নিজের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি? মানসিক অবসাদের একটা বর্ম পরে নিজেকে ঠকাচ্ছি?
― কখনো কখনও নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকে না, ডিপ্রেশনও কিন্তু সবসময় ইন্টেনশনালি এডপ্ট করা যায় না।
― ভালোবাসাও তো তাই! নিজের তবু নিজের আয়ত্তে থাকে না!
কৃতি অবাক দৃষ্টিতে তাকায় অরণ্যার দিকে। অরণ্যা অন্যমনস্ক হয়েই প্রশ্ন করে, ভালোবেসেছ কখনও?
অরণ্যার প্রশ্নের উত্তরে একটু হাসার চেষ্টা করে কৃতি। অস্ফুটে বলে, "এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর!"

( প্রথম পর্ব সমাপ্ত ) 

মন্তব্যসমূহ