প্রথম পর্ব - পুনর্জন্ম
জৈষ্ঠ্য মাসের এক অতিসাধারণ সংক্রান্তির কথা। সে বছর মাঝারিরকমের বর্ষায় ঝিঝিঁ-ডাকা সকালটুকু বেশ মনে পড়ে। আবছা, অন্ধকার। তার ফ্যাকাসে ত্বকে প্রাথমিক ভাবে কেবল হালকা জলের পোচ মেরেছেন যেন কোনও বিষণ্ন চিত্রকর। তারপর ক্যানভাস ফেলে ফিরে গেছেন জানালার পাশে।
ধরা যাক সেই জানালাতেই আরও একটি আধ-খাপচা ক্যানভাস পড়ে আছে। বহু আগে তাতে রঙ পড়েছিল। চিত্র অসমাপ্ত তবু শিল্পীর আর আঁকবার সাধ হয়নি এতদিন। হঠাৎ কীসের খেয়ালে তাঁর চোখ পড়ল শুকিয়ে ওঠা ক্যানভাসটির দিকে। স্থানে স্থানে ধুলোর পরত। দয়া হল কি তাঁর? তিনি ধুলো ঝেড়ে প্যালেট হাতে মুখোমুখি বসলেন। আলগোছে তুলে নিলেন '391 sap green'...
এই সামান্য ঘটনাকে যদি পুনর্জন্ম বলা যায়, সেদিন ৩১ শে জ্যৈষ্ঠ' ১৪১৭ ( ইং ১৪ই জুন'২০১০, সোমবার) - ক্যানভাসটির অর্থাৎ কি না আমার পুনর্জন্ম।
এবার চিত্র, সে তো নিজে জানে না কালে কালে তার গতিবিধি কীভাবে পাল্টাবে। যদ্দুর মনে হয়, চিত্রকর-ও খুব সীমিতই জানেন। আজ ঠিক দশ বছর পরে যখন সেই পরিবর্তনের কথা লিখতে বসেছি, খানিক রোমাঞ্চিত হতে হচ্ছে। জ্ঞানাবধি যা ছিলাম- অনেকখানি লাল, দু-তিন রকম নীল, হলুদ আর সবুজের সেড, 'কমলা রঙের রোদ'। এসব অবশ্য একেক বয়সে একটু একটু করে খুব সন্তর্পণে এসে মিশেছে। তারপর এক স্বল্পদীর্ঘ আলোহীনতা পেরিয়ে সেই আষাঢ়ের প্রাক্কালে আমাকে অনেকটাই অবাক করে দিয়ে শিল্পী যখন শরীরে শ্যাওলা রং ছোঁয়ালেন...অনতিদূরে ফুটে উঠলো একটি দ্বিতল স্কুলবাড়ি। দৃশ্যমান শালবনের পাশে তার সামান্য অস্তিত্বটুকু সহজপাঠ-র ছবির মতো কল্পনা করে নিতে হয়। লাগোয়া একচিলতে বাগান, কোণে ছোট্ট রান্নাঘরে বড় বড় মাটির উনান দু-খানিতে ভাত, ডাল, সবজি ফুটছে। পরে ধীরে ধীরে জেনেছি খিদে ফোটার কথা, শৈশব ফোটার কথা। আনন্দ, হাসি, কান্না, অভাব সবকিছু সহজপাচ্য হয়ে ওঠে ওই দু-খানি মাটির উনানে। এসব জেনেছি আর একেক রঙের পোচ পড়েছে শরীরে। পাশে টলটলে পুকুরের জল। অশ্বত্থগাছে ঘেরা বারোয়ারি ঘাট বেয়ে পোষা হাঁসেদের ঝাঁক নেমে যাচ্ছে। সেখান থেকে দৃষ্টি সরলরেখায় গেলে অস্পষ্ট শুশুনিয়া-কে ধরা যায়। পেছনের মাঠে ধানের বীজতলা বেড়ে উঠেছে আঙুল সমান। আর আর দিগন্তে দৃষ্টি শেষের একটু আগেই জেগে উঠেছে নদীর চর।
এই আমার পুনর্জন্মের আঁতুরঘর। তীর্থ-ও। এক প্রকান্ড বটগাছ আলো-ছায়ার ছক কেটে রেখেছে ঘরটির চারিদিকে। একেকটি ছক একেকটি শ্রেণী। আমি সেদিন প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। সামনে ধবধবে মেঝেতে বসে আমার চৌত্রিশটি শিক্ষক-শিক্ষিকা সুর করে দুলে দুলে পড়ছেন,
"ছোট খোকা বলে অ আ
শেখেনি সে কথা কওয়া"...
----
১৪ জুন'২০২০
মন্তব্যসমূহ